Education

January 2023
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

লাখো কন্ঠে সোনার বাংলা

প্রশ্ন : ৩.৩। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতিসমূহ ব্যাখ্যা কর । অথবা, পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধর।

মৌলিক গণতন্ত্র অধ্যাদেশ কে কবে জারি করেন

পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতিসমূহ

 ভূমিকা :

 সকল জাতির সত্তার সমান অধিকার সংরক্ষণ ও সুনিশ্চিত করার দৃপ্ত ঘোষণা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির মূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। পাকিস্তানের মতো বহুভাষী এবং ভিন্ন সংস্কৃতির অধিকারী ও ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন নাগরিকদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য এবং সংহতি সুদৃঢ় করতে হলে তাদের মধ্যে ‘একজাতি- এক রাষ্ট্র’ এই চেতনাবোধ সৃষ্টি করার প্রয়োজনীয়তা ছিল।

তা সম্ভব ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও সহানুভূতি সৃষ্টি করে একের সমস্যা অন্যের অনুধাবন করার মানসিকতা অর্জনের মাধ্যমে । কিন্তু পাকিস্তান জন্মলাভের অব্যবহিত পরেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানকে প্রাপ্ত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল । রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, শিক্ষা, সামরিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে তীক্ততার সৃষ্টি করেছিল ।

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বিরাজমান বৈষম্য :

 পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে প্রায় দেড় হাজার মাইলের ব্যবধান বিদ্যমান ছিল । একমাত্র ধর্মীয় মিল ছাড়া আর কোনো ক্ষেত্রেই পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না । পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছিল তা নিরূপ :

প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পাকিস্তান ব্রিটিশদের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে এক সুশৃঙ্খল আমলাগোষ্ঠী লাভ করে । পাকিস্তান সৃষ্টির পর আমলাগোষ্ঠীই প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হয় । কিন্তু এ আমলাগোষ্ঠীতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগন্য । নবগঠিত পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের উচ্চ পদগুলোর সবগুলোই পশ্চিম পাকিস্তানীদের জন্য বরাদ্দ ছিল । ১৯৪৭ সালের পর ১৫ জন প্রাদেশিক সিভিল সার্ভিসের সদস্যকে পদোন্নতি দেয়া হয়, যার মধ্যে ৪ জন ছিল বাঙালি । উপরন্তু করাচীতে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করা হলে সেখানকার বিভিন্ন অফিস আদালতে সৃষ্ট নতুন ছোট-বড় পদে পশ্চিম পাকিস্তানীরাই একচেটিয়া চাকুরি লাভ করে । এ বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে ।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে শিক্ষাক্ষেত্রেও বৈষম্য বিরাজিত ছিল । পূর্ব পাকিস্তানীদের বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশরোধ এবং চাকুরির ক্ষেত্রে তাদেরকে বঞ্চিত করে রাখাই ছিল পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর বৈষম্যমূলক শিক্ষানীতির মূল উদ্দেশ্য। ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় দ্বিগুণ । ১৯৬৮-৬৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ৬টি এবং পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৪টি। শুধু শিক্ষায়তনের ক্ষেত্রেই নয়, উচ্চ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য নানা ধরনের বৃত্তি ও অর্থ *সাহায্যের অধিকাংশ সুযোগ-সুবিধা পশ্চিম পাকিস্তানীরাই ভোগ করেছে ।

সামরিক ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক বৈষম্য ছিল পর্বত প্রমাণ । দেশরক্ষা বাহিনীর তিনটি (সেনা, নৌ ও বিমান) সদর দফতরই স্থাপিত হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসাররা সবাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী । ফলে সামরিক প্রশাসন ছিল সম্পূর্ণরূপে পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে । যার ফলে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পদে পশ্চিম পাকিস্তানীদের একচেটিয়া প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয় । তাছাড়া প্রতিরক্ষাখাতে যে ব্যয় বরাদ্দ ছিল তার পুরোটাই ব্যয় হয় পশ্চিম পাকিস্তানে । ১৯৪৭ – ৫৬ সময়কালে প্রতিরক্ষাখাতে মোট ব্যয় ছিল ৪৫৬৫.৭ মিলিয়ন টাকা । এর মধ্যে মাত্র ১৬৭.২ মিলিয়ন টাকা ব্যয় করা হয় পূর্ব পাকিস্তানে। একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত প্রতিরক্ষা সদর দফতরগুলোর প্রশাসনিক খরচ ছিল ২৫৬৩.৯ মিলিয়ন টাকা।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পাকিস্তানের দু’অংশের মধ্যে অপর একটি রাষ্ট্রের উপস্থিতি একে রাজনৈতিক দিক থেকে কিছুটা দুর্বল করেছিল । পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল । পূর্বপাকিস্তান জনসংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় কার্যে এর সিংহভাগ দাবি করে । কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান এ দাবি মেনে নিতে পারে নি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ও নবগঠিত সরকারকে অবৈধ ক্ষমতা বলে শাসকগোষ্ঠী স্থায়ী হতে দেয় নি তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে পাশ কাটিয়ে ঔপনিবেশিক শাসন অব্যাহত রাখে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানেও পূর্ব পাকিস্তানকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন থেকে বঞ্চিত করা হয়।

 উপরন্তু ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া আদায়ের রাজনৈতিক অধিকারকে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী গলা টিপে হত্যা করতে উদ্ধত ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে শাসকচক্র সীমাহীন রাজনৈতিক বৈষম্য ও দূরভিসন্ধি চরিতার্থ করতে তৎপর ছিল ।

সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য :

 পাকিস্তানী শাসকচক্র পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি প্রথমেই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে মেতে উঠে । প্রথমেই তারা পূর্ব বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক সত্তা বাংলা ভাষাকে স্তব্ধ করার হীন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় । ১৯৫১ সালের আদমশুমারি রিপোট অনুযায়ী সমগ্র পাকিস্তানের ৫৬.৪০ ভাগ জনগণের ভাষা বাংলাকে জলাঞ্চলী দিয়ে মাত্র ৩.২৭ ভাগ লোকের ভাষা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করতে উদ্ধত হয়। তাদের এই হীনষড়যন্ত্র ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে মহান ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পরবর্তীতে বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা লাভ করে ।

সমাজ কল্যাণের ক্ষেত্রে বৈষম্য :

 সমাজ কল্যাণের ক্ষেত্রেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য পরিলক্ষিত হয় । পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি থাকা সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানে হাসপাতাল, ডাক্তার, পল্লী স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রভৃতির সংখ্যা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। পশ্চিম পাকিস্তানে যেখানে ডাক্তারের সংখ্যা ছিল ১২৪০০ জন সেখানে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ৭৬০০ জন । এছাড়া অন্যান্য সমাজকল্যাণমূলক কার্যাবলির ক্ষেত্রেও পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম বৈষম্য প্রদর্শন করা হয় ।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বিদ্যমান বৈষম্যগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য ছিল সর্বাপেক্ষা প্রকট । পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬% জনের বাস ছিল পূর্ব পাকিস্তানে এবং পাকিস্তানের জাতীয় আয়ের সিংহভাগই যোগান দিত পূর্ব পাকিস্তান। অথচ পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যয় বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ২০% ! অবশ্য পরে তা বৃদ্ধি করে ৩০% করা হয় । ১৯৪৭ – ৫৫ সময়কালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যে অর্থ ব্যয় করেন তার প্রায় ৯০% ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে । উক্ত সময়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে রাজস্ব আয় হয় ৭৬৮১ মিলিয়ন টাকা ।

 কিন্তু এ অর্থের মাত্র ৪২৭ মিলিয়ন টাকা সেখানে ব্যয় করা হয় । তাছাড়া মুদ্রা ও অর্থনীতি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে থাকায় অতি সহজেই পূর্ব পাকিস্তানের আয় পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেত । পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৪৮ – ৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে সম্পদ পাচারের পরিমাণ ছিল ২১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ।

বৈদেশিক সাহায্য বণ্টনের ক্ষেত্রে বৈষম্য : 

বৈদেশিক সাহায্য বণ্টনের ক্ষেত্রেও দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য বিদ্যমান ছিল । পাকিস্তানে যেসব বৈদেশিক ঋণ ও সাহায্য আসতো তার সিংহভাগ ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে । অথচ পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ভিত্তিতেই বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ সাহায্য আসতো এবং সে ঋণের সুদ পূর্ব পাকিস্তানকেই বেশি বহন করতে হতো। ১৯৫৬ সালে চীন পাকিস্তানকে যে ৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ প্রদান করেছিল তার সিংহভাগই ব্যয় করা হয় পশ্চিম পাকিস্তানে ।

উপসংহার : 

পরিশেষে বলা যায় যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের অর্থনৈতিক মুক্তি ও আশা-আকাঙ্খা পূরণের যে স্বপ্ন দেখেছিল, পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পর থেকে তাদের সে আশা হতাশায় পরিণত হয় । ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মতো পাকিস্তানী আধা ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও সেখানকার জনসাধারণ। 

প্রশাসনিক, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সামরিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে পূর্ববাংলার প্রতি যে সীমাহীন বৈষম্যমূলক নীতি গৃহীত হয়েছিল. তা প্রকারান্তরে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর এদেশ থেকে বিতাড়নের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। এই বৈষম্যমূলক নীতির ফলে সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে পড়া পূর্বপাকিস্তানীরা তাদের মুক্তি অর্জনের জন্য ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয়, গড়ে তোলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলন, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *