আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক Relation Between Law and Liberrty :

আইনের সম্পর্ক :

আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে পরস্পরবিরোধী দুটি মতবাদ প্রচলিত আছে।

আইন ও স্বাধীনতার গভীর সম্পর্কের বিষয়ে মতামত ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যারিস্টটল (Aristotle),

জন লক (John Locke), জ্যা জ্যাক রুশো (Jean-Jacques Rousseau), উইলোবি (Willoughby), বার্কার (Barker), লাস্কি (Laski) প্রমুখ।

তাঁদের মতে আইন সামাজিক কল্যাণ সাধন করে, ব্যক্তিত্ব বিকাশের পথ সুগম করে ও স্বাধীনতার ক্ষেত্র প্রসারিত করে। অপর পক্ষ মনে করে, আইন ও স্বাধীনতা পরস্পরবিরোধী।

এ মতবাদ যাঁরা সমর্থন করেন তাঁরা হলেন জন স্টুয়ার্ট মিল (J. S Mill), ডাইসি (Dicey), হার্বার্ট স্পেন্সার (Herbert Spencer)।

এ বিষয়ে তাঁদের যুক্তি হলো, আইন স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে সংকুচিত করে তোলে। অধ্যাপক ডাইসির মতে, “আইন বৃদ্ধি পেলে স্বাধীনতা কমে এবং স্বাধীনতা বৃদ্ধি পেলে আইন কমে।”

আইন ও স্বাধীনতার সম্পর্ক নিয়ে দু’ধরনের মতবাদ থাকা সত্ত্বেও আইন ও স্বাধীনতার গভীর সম্পর্কের বিষয়টি অধিক যৌক্তিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।

কারণ, আইন ও স্বাধীনতা পরস্পর পরিপূরক।

১। আইন স্বাধীনতার শর্ত : আদর্শবাদী দার্শনিকগণ আইনকে স্বাধীনতার শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

সমাজব্যবস্থায় আইন না থাকলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করত, সামাজিক অন্যায়-অবিচার বেড়ে যেত।

অধ্যাপক রুশো বলেন, “Obedience to a law which we prescribe to ourselves is liberty.”

২। আইন স্বাধীনতার রক্ষক : আইন স্বাধীনতাকে যথাযথভাবে উপভোগ করার সুযোগ সৃষ্টি করে।

আইনের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ব্যক্তির স্বাধীনতা ভোগে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত হয়।

এজন্য জন লক যথার্থই বলেছেন, “Where there is no law, there is no liberty.”

অর্থাৎ, “যেখানে আইন থাকে না, সেখানে স্বাধীনতা থাকতে পারে না।”

৩। আইন ব্যক্তিত্ব বিকাশে সহায়ক : স্বাধীনতা উপভোগের মাধ্যমে নাগরিকের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে।

রাষ্ট্র আইন প্রণয়ন করে নাগরিকের স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্র প্রসারিত করে।

উদাহরণস্বরূপ, শ্রমিক অধিকার আইন, শিশু ও নারী অধিকার রক্ষা আইন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আইন সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি আনয়ন করে ব্যক্তিত্বের বিকাশ সাধন করছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রিচি বলেন, “স্বাধীনতাকে যদি আত্মবিকাশের জন্য আবশ্যক সুযোগ-সুবিধা বোঝায় তবে তা অবশ্যই আইনের দ্বারা সৃষ্টি হয়।”

৪। আইন স্বাধীনতার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে : আইনের মাধ্যমে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়।

জননিরাপত্তা আইন সামাজিক অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে মানুষের স্বাধীনতা ভোগের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে। আইনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকারসমূহ ভোগের ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়।

উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তামূলক আইন, শ্রমিককল্যাণ আইন, নারী অধিকার রক্ষা আইন ইত্যাদি আইন জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে সহায়তা করে স্বাধীনতা ভোগের সুযোগ করে দেয়।

৫। আইন স্বাধীনতার অভিভাবক : আইন স্বাধীনতার অভিভাবক ও পরিচালক হিসেবে কাজ করে।

রাষ্ট্রীয় আইন মানুষকে অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত রাখে। মানুষ আইনের আশ্রয়ে নির্বিঘ্নে স্বাধীনতা ভোগ করে।

আইন স্বাধীনতাকে সব অশুভ শক্তি থেকে রক্ষা করে।

৬। আইন দ্বারা স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত : স্বাধীনতা অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন হলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।

স্বাধীনতাকে আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রিত না হলে দুর্বলের স্বাধীনতা খর্ব হবে।

শিল্প-কারখানার মালিকপক্ষ অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা ভোগ করলে শ্রমিকপক্ষের স্বাধীনতা খর্ব হয়।

অধ্যাপক উইলোবির মতে, “Freedom exists only when there is restraint.” অর্থাৎ, “নিয়ন্ত্রণ আছে বলেই স্বাধীনতার অস্তিত্ব টিকে থাকে।”

৭। কিছু আইন স্বাধীনতাকে খর্ব করে : অনেক সময় রাষ্ট্রের প্রয়োজনে জনস্বার্থবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়।

এসব আইন ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করে।
যেমন- ব্রিটিশ শাসনামলে রাওলাট আইনসহ বেশকিছু আইন জনগণের স্বাধীনতাকে খর্ব করেছিল।

৮। আইন স্বাধীনতার সহায়ক : আইন স্বাধীনতাকে সহযোগিতা করে বিধায় সবাই স্বাধীনতা উপভোগ করতে সক্ষম
হয়।

আইনের মাধ্যমে স্বাধীনতার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হয় এবং জনগণের আত্মবিকাশের পথ উন্মুক্ত হয়।

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায় যে, আইন ও স্বাধীনতার মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে সব আইন স্বাধীনতার জন্য সহায়ক নয় ।

কেননা অনেক সময় একটি গণবিরোধী আইন স্বাধীনতাকে বিপন্ন করতে পারে। তদুপরি, আইন ও স্বাধীনতা পাশাপাশি অবস্থান করে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতিকে সুদৃঢ় করে ।