পাঠ-৪.১ : ই-গভর্ন্যান্স
E-Governance:
সুশাসন হলো এমন এক ব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের সব কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সরকারের সেবা পেতে পারে।
রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সব ক্ষেত্রে জনগণের অধিকার নিশ্চিতকরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ, তথ্যের অবাধ প্রবাহ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে সুশাসন।
আর এ সুশাসন বাস্তবায়নের অন্যতম মাধ্যম হলো ই-গভর্ন্যান্স । আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে গতিশীলতা আনয়ন করে ই-গভর্ন্যান্স।
ই-গভর্নান্স সরকারের কর্মসম্পাদনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করে । ই-গভর্ন্যান্সের অন্যতম বাহন হলো ইন্টারনেট।
আধুনিক সমাজকে যথার্থভাবেই তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ বলা হয়।
সমাজের প্রতিটি স্তরে জনগণের কল্যাণে তথ্যের সহজ প্রবেশাধিকার ও ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা বর্তমান সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন এবং এর ব্যবহার, বিশেষ করে ইন্টারনেট ও ওয়েব বিপ্লব সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে এনেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন।
সরকারের প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, নাগরিক সেবা প্রদান, নাগরিকের সাথে সরকারের যোগাযোগ, সরকারের অভ্যন্তরীণ এবং বহিস্থ লেনদেন ও যোগাযোগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, কূটনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে এখন নানা ধরনের প্রযুক্তি ও নতুন মিডিয়ার বহুল ব্যবহার পরিলক্ষিত হয় ।
নব প্রবর্তিত এসব প্রযুক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে তথ্যের অবাধ প্রবাহ, যোগাযোগ ও সেবার
কাজকে সহজতর করেছে।
কোনো সরকার-প্রক্রিয়ার কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারের কর্মকাণ্ড ও শাসনব্যবস্থায় গতিশীলতা, সংবেদনশীলতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়নের নিমিত্তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রয়োগই হচ্ছে ইলেকট্রনিক গভর্ন্যান্স (Electronic Governance)।
ইলেকট্রনিক গভর্ন্যান্স-এর সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ই-গভর্ন্যান্স (E-Governance) । ইলেকট্রনিক গভর্ন্যান্সের সমার্থক প্রত্যয় হিসেবে ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, অনলাইন গভর্ন্যান্স, ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ইত্যাদি ব্যবহার করা হয়।
“ইলেকট্রনিক গভর্ন্যান্স’-এর সাথে ‘ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট’ বা ‘ই-গভর্নমেন্ট’ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, তবে ধারণাগতভাবে এ দুটি প্রত্যয়ের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য রয়েছে।
ই-গভর্নমেন্ট যেখানে স্বয়ংক্রিয় বা যেখানে অনলাইন সরকারব্যবস্থা সেখানে ই-গভর্ন্যান্স হচ্ছে সরকারের প্রতিষ্ঠান ও জনপ্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কার্যক্রমের উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ।
ই-গভর্নমেন্ট সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল, যা আইনগতভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত।
অন্যদিকে ই-গভর্ন্যান্স পদ্ধতিগত কৌশল, যা সহযোগিতামূলক প্রশাসনিক সম্পর্কের সাথে জড়িত।
ইউনেস্কোর সংজ্ঞানুযায়ী সাধারণভাবে ই- গভর্ন্যান্সের ধারণা ই-গভর্নমেন্টের তুলনায় ব্যাপক হিসেবে বিবেচিত।
ই-গভর্ন্যান্সের উদ্দেশ্য হলো তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের সাথে সরকার ও একে অপরের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন, নাগরিকদের সামর্থ্য ও ক্ষমতায়ন জোরদার করা।
বিভিন্ন ব্যক্তিত্ব ই-গভর্নমেন্ট ও ই-গভর্ন্যান্সের সংজ্ঞা এবং ধারণার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য রেখা টানেননি ।
থমাস গর্ডন (Thomas Gordon)-এর মতে, “E-Governance is Simply the use of information and Communication technology, such as internet, to improve the process of government.”
অর্থাৎ, “ই-গভর্ন্যান্স হচ্ছে সাধারণভাবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি তথা ইন্টারনেট ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার উন্নয়ন করা।”
ম্যাথিয়াস ফিঞ্জার ও গেইলি পিকাউড (Matthias Finger and Gaelle Pecoud) ই-গভর্ন্যান্সের তিনটি প্রধান
ধারণার কথা উল্লেখ করেছেন :
(ক) জনসন্তুষ্টি হিসেবে ই-গভর্ন্যান্স (E-governance as customer satisfaction);
(খ) প্রক্রিয়া ও মিথষ্ক্রিয়া হিসেবে ই-গভর্ন্যান্স (E-governance as processes and interactions) ও
(গ) উপকরণ হিসেবে ই-গভর্ন্যান্স (E-governance as tools) ।
ইউনেস্কো (UNESCO) প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী- “E-governance is the public sectors use of information and communication technologies with the aim of improving information and service delivery, encouraging citizen participation in the decision-making process and making government more accountable, transparent and effective.”
অর্থাৎ, “তথ্য ও সেবা বিতরণ, উন্নয়ন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় নাগরিকদের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান এবং সরকারকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারই হলো ই-গভর্ন্যান্স।”
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আবদুল কালাম ই-গভর্ন্যান্সের সংজ্ঞায় বলেছেন,
“A transparent smart e-governance with seamless access, secure and authentic flow of information crossing the interdepartmental barrier and providing a fair and unbiased service to the citizen.”
অর্থাৎ, “সন্ধিহীন প্রবেশ, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রবাহসহযোগে একটি স্বচ্ছ স্মার্ট ই-গভর্ন্যান্স আন্তঃবিভাগীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করে নাগরিকদের ন্যায্য ও পক্ষপাতহীন সেবা প্রদান করে।”
সুতরাং ই-গভর্ন্যান্স বলতে সহজ-সরল, নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন, জবাবদিহিমূলক, দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বা সাড়াদানকারী ও স্বচ্ছতাপূর্ণ সরকারব্যবস্থাকে বোঝায়।
সরকার কর্তৃক প্রণীত রাষ্ট্রের আইনকানুন, আদেশ, বিধিবিধান, পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া ইত্যাদি অবশ্যই সহজ, সরল ও নাগরিকবান্ধব হবে।
নৈতিক মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে ই-গভর্ন্যান্স পরিচালিত হবে, যা প্রতিটি সেবা ও কর্মকাণ্ডের জন্য নাগরিকদের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে।
নাগরিকদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল হবে এবং ই-গভর্ন্যান্সের প্রতিটি কর্মকাণ্ড স্বচ্ছতার সাথে পরিচালিত হবে।
ই-গভর্ন্যান্স সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে হলে ই-গভর্নমেন্ট সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।