প্রশ্ন : ৮.৪। ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের বিবরণ দাও ।অথবা, ১৯৭১ সালের মার্চের অসহযোগ আন্দোলনের বর্ণনা দাও।

0
532

১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের বিবরণ

উত্তর : ভূমিকা : ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৪৭ সালে ‘পাকিস্তান’ নামক রাষ্ট্রটি সৃষ্টির পর থেকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য ও বিমাতাসুলভ আচরণের প্রেক্ষিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবোধের যে উন্মেষ ঘটে সময়ের গতিধারায় বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে।

এ নির্বাচনে পূর্ববাংলার প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগ প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সরকার গঠনের অধিকার লাভ করলেও পশ্চিমা সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো চক্র সে অধিকারকে বানচাল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। এমনকি ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন । এমতাবস্থায় শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় অসহযোগ আন্দোলন ।

অসহযোগ আন্দোলনের পটভূমি : ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭ টি ও প্রাদেশিক পরিষদে ২৮৮ আসন লাভ করে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সঙ্গত কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করবে।

১৯৭১ সালের মধ্য জানুয়ারিতে সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে তিনদিন ধরে শেখ মুজিবের সাথে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সংবিধান প্রণয়ন ও ক্ষমতা হস্তান্তর বিষয়ে আলোচনা করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোও ২৭-২৯ জানুয়ারি ঢাকায় শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে একই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন এবং আলোচনা শেষে ছয় দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের বিপক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন।

এসব আলোচনার পর ১৪ ফ্রেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন যে, সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে জাতীয় সংসদের অধিবেশন ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে। এ ঘোষণা সত্ত্বেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও পশ্চিম পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা ভুট্টো বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার বিষয়ে নতুন চক্রান্তে মেতে উঠে। আর এ চক্রান্তের প্রেক্ষিতেই জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ করাচি থেকে বেতার ভাষণের মাধ্যমে ৩ মার্চে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন।

এরই প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানবাসী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। শেখ মুজিবুর রহমান ২ মার্চ, ১৯৭১ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতালের ডাক দেন। অতঃপর ৩ মার্চ অপরাহ্ন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ সভাপতি নূরে আলম সিদ্দিকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পল্টনের বিরাট জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। বস্তুত ইয়াহিয়া কর্তৃক ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশ স্থগিত ঘোষণা করার মধ্য দিয়েই ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের বাস্তব পটভূমি প্রস্তুত হয়।

অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্য : পূর্ব পাকিস্তানিদের ন্যায়সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা তথা নির্বাচনি ফলাফল অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করাই ছিল ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের লক্ষ্য। তবে প্রধানত দুটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। যথা— পূর্ব পাকস্তান থেকে পাকিস্তানি শাসনের অবসান ঘটানো এবং ১৯৬৬ সালে উত্থাপিত ছয় দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রকৃতি : ১৯৭১ সালের ১ মার্চে ইয়াহিয়ার ঘোষণার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমান ৩ মার্চ থেকে যে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন তা ঘটনা পরম্পরায় শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে পর্যবসিত হয়। এক্ষেত্রে অসহযোগ আন্দোলনের গতি-প্রকৃতিকে নিম্নলিখিত কয়েকটি পর্যায়ে বিভক্ত করে আলোচনা করা যায় :

(ক) প্রথম পর্যায় : জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হঠাৎ স্থগিত ঘোষণার বিরুদ্ধে ৩ মার্চের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানের মধ্য দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম পর্যায় শুরু হয়। ঐ দিনই তিনি সরকারের নিকট ১. অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার, ২. সশস্ত্র বাহিনীকে ব্যারাকে প্রত্যাবর্তন ও ৩. জনপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করেন। পাশাপাশি তিনি ৬ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিদিন ৬-২ টা পর্যন্ত হরতাল ও ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভা সফল করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান। এমনকি ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের ট্যাক্স প্রদান বন্ধ রাখার জন্য তিনি জনগণকে নির্দেশ দেন। এমতাবস্থায় ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ৬ মার্চ জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।

(খ) দ্বিতীয় পর্যায় : ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্য দিয়ে অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায় সূচিত হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ের এ ঘটনাবলিকে নিম্নলিখিত দুটি ভাগে বিভক্ত করে আলোচনা
করা যায় । যথা—

১. শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ : ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ পূর্ব বাংলার গণমানুষের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বিশাল জনসভায় এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন যা ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ’ নামে অভিহিত।

উক্ত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলে অসহযোগ আন্দোলনের গতিধারা প্রবল বেগবান হয়ে উঠে। ৭ মার্চের ভাষণে শেখ মুজিব ২৫ মার্চের অধিবেশনে অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে ৪ দফা কর্মসূচি আরোপ করেন এবং অসহযোগ আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য জনগণকে উদাত্ত আহ্বান জানান। শেখ মুজিবের আরোপিত ৪টি পূর্বশর্ত ছিল নিম্নরূপ : (ক) অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে হবে। (খ) অবিলম্বে সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে। (গ) সামরিক বাহিনী কর্তৃক সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে হবে। (ঘ) জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের পূর্বে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।

২. শেখ মুজিবের দশ দফা কর্মসূচি : ৭ মার্চ ভিন্ন এক ঘোষণায় শেখ মুজিব পরবর্তী সাতদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য দশ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এক স্টেটমেন্টে তিনি বলেন যে, সামরিক আইন প্রত্যাহার এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহতই থাকবে। এভাবে ৭ মার্চের ভাষণ ও দশ দফা কর্মসূচি ঘোষণার মাধ্যমে শেখ মুজিব অসহযোগ আন্দোলনে একটি নতুন মাত্রার সংযোজন ঘটান ।

(গ) তৃতীয় পর্যায় : অব্যাহত অসহযোগ আন্দোলনের প্রতি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থন ও সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব ১৪ মার্চ এক বিবৃতির মাধ্যমে পূর্ববর্তী সকল কর্মসূচি বাতিল করে ১৫ মার্চ থেকে পালন করার জন্য ৩৫টি কর্মসূচি সংবলিত একটি সুনির্দিষ্ট নির্দেশনামা প্রদান করলে অসহযোগ আন্দোলন ব্যাপকতর হতে থাকে।

এ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে একটি সমান্তরাল সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় সর্বস্তরের জনগণ অসহযোগের কর্মসূচি গ্রহণ ও তা পালন করতে থাকলে ১৫ মার্চ কঠোর সামরিক প্রহরায় প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন এবং ১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

১৭, ১৯ ও ২০ মার্চ উভয়ের মধ্যে কয়েক দফা বৈঠকের পর সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি সাধিত হলেও ২১ মার্চ ভুট্টো ঢাকায় এসে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধাচরণ করতে থাকেন। ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চের অধিবেশন স্থগিত করেন ৷

অন্যদিকে অসহযোগ আন্দোলন অব্যাহত থাকে এবং ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস পূর্ববাংলায় প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালিত হয়। এভাবে অসহযোগ আন্দোলন চললেও আলাপ-আলোচনার অন্তরালে ইয়াহিয়া খান সামরিক কায়দায় সমস্যার সমাধানের জন্য ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্র চূড়ান্ত করেন। তবে বিভিন্ন আলাপ-আলোচনার যথেষ্ট অগ্রগতি ও ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার খসড়া সম্পন্ন হলে ২৫ মার্চ দুপুরের পর থেকেই অসহযোগ আন্দোলনের গতি মন্থর হয়ে যায়।

শেখ মুজিব কর্মীদের যার যার এলাকায় চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। অন্যদিকে ইয়াহিয়া-ভুট্টো গোপন বৈঠকে মিলিত হয়ে ঢাকা ত্যাগের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। অতঃপর সমস্যা সমাধানের খসড়া প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষর না করে ইয়াহিয়া খান ২৫ মার্চ ঢাকা ত্যাগ করেন। তার ঢাকা ত্যাগের পর ২৫ মার্চ রাত থেকেই পূর্ববাংলার নিরস্ত্র মানুষের উপর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই অসহযোগ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বাধীনতা ও মুক্তির যুদ্ধ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীকে ১৯৭০ সালের নির্বাচনি ফলাফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করার এক দুর্বার গণআন্দোলন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় এ আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বর্বর ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে অসহযোগ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়। দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত সার্থকতা প্রতিপন্ন হয়।