প্রশ্ন : ৩। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব কি?অথবা, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের তাৎপর্য কি ছিল?

0
220

১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব

উত্তর : ভূমিকা : ১৯৭০ সালের ৭ ও ১৭ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সর্বত্র জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার কয়েকটি আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালের ১৭ জানুয়ারি তথাপি সামগ্রিকভাবে এ নির্বাচন ১৯৭০ সালের নির্বাচন হিসেবেই পরিচিত। এ নির্বাচনকে পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন তথা বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় ৷

১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব : নিম্নে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের গুরুত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো :

১. বাঙালির ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় : ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে ঐক্যবোধ গড়ে উঠে সময়ের গতিধারায় ৬ দফা ও ১১ দফা আন্দোলন এবং ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার শাণিত ধারা লক্ষ করা যায়। আর ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের ফলে বাঙালি ও বাংলার মানুষের ঐক্য ও সংহতি যে সুদৃঢ় তা প্রকাশ পায় ।

২. পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা : এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ ও এ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের নির্ধারিত ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসন এবং প্রাদেশিক পরিষদে ৩১০ টি আসনের মধ্যে ২৯৮ আসন লাভ করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিবুর রহমানের বিপুল জনপ্রিয়তা প্রকাশ পায় ।

৩. পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা : ১৯৭০ সালের নির্বাচনে উভয় পরিষদে আওয়ামী লীগের বিজয়ের ফলে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সম্ভাবনা দেখা দেয়। আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের দেওয়া এ ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে জনগণ অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহের কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করে ।

৪. আঞ্চলিক দলের স্বীকৃতি : ১৯৭০ সালের নির্বাচনের রায় স্বাভাবিকভাবেই আওয়ামী লীগ ও পিপলস পার্টিকে আঞ্চলিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। দুটি দলই নিজেদের অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বের অধিকার লাভ করে ।

৫. একক কর্তৃত্বের অবসান বার্তা : এ নির্বাচন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একক কর্তৃত্বের অবসান বার্তাস্বরূপ। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করায় আওয়ামী লীগ ও বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব লাভের ন্যায্য সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়। এর ফলে এতদিনের পশ্চিমা কর্তৃত্বের অবসান সূচিত হয়।

৬. বাঙালির সংগ্রামী চেতনা জাগ্রত : নির্বাচনি রায় মোতাবেক ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতিকে সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। তারা আরো আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়, যা তাদেরকে মুক্তি সংগ্রামে নিবেদিত করে।

৭. স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বার্তাবাহক : সর্বোপরি ১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার বার্তাবাহক। এই নির্বাচনি রায় মোতাবেক যে রাজনৈতিক সংঘাত ও জটিলতা সৃষ্টি হয় তার পথ ধরেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন যুগপৎ পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। মূলত ১৯৭০ সালের নির্বাচন বিশ্বের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ঘটনা ।