সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমস্যা সমাধানের উপায় Measures to Remove the Problems of Good Governance:

0
94

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমস্যা সমাধানের উপায় :
Measures to Remove the Problems of Good Governance:

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সমস্যাগুলো দূরীকরণে সরকারের পাশাপাশি জনগণকে দায়িত্বশীল হতে হবে।

রাষ্ট্রে সুশাসন গড়ে তুলতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, সুশীলসমাজ তথা সব সচেতন নাগরিকের সরাসরি অংশগ্রহণ।

নিচে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সমস্যাগুলো সমাধানের উপায়সমূহ আলোচনা করা হলো :

১। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা : রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ত্বরান্বিত হয়।

সরকারের প্রশাসনিক কাজে গতিশীলতা আসে এবং রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চা রাজনৈতিক উন্নয়নের পথকে সুগম করে।

জবাবদিহিতার মাধ্যমে সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতি প্রতিরোধ করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।

২। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা : আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসন ত্বরান্বিত হয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার ও জনগণকে একযোগে কাজ করতে হয়।

এক্ষেত্রে সরকারের সতর্ক দৃষ্টি ও আন্তরিকতা যেমন জরুরি, সেই সাথে জনগণেরও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় আইন শুধু নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য নয়। আইনের শাসন সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সমভাবে স্বস্তি আনয়ন এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করে।

আইনসভার সদস্যগণ নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকার জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, সমস্যা ইত্যাদি আইনসভায় তুলে ধরেন।

৩। কার্যকরী আইনসভা : সংসদীয় গণতন্ত্রে আইনসভার সদস্যরা হলেন জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি।

আইনসভার অধিবেশনে আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে যেকোনো সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে পাওয়া যায়।

কার্যকরী আইনসভার মাধ্যমে শাসন বিভাগের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয় এবং সুশাসনের পথ সুগম হয়।

৪। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ : স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগের মাধ্যমে আইনের শাসনের নিশ্চয়তা বিধান করা যায়।

আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হয়। বিচার বিভাগকে আইন ও শাসন বিভাগের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বমুক্ত করার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিচারকদের সামাজিক মর্যাদা ও যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।

৫। বিকেন্দ্রীকরণ : সুশাসনের জন্য প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ প্রয়োজন। রাষ্ট্রের প্রশাসনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে নিয়োজিত না থেকে আঞ্চলিক ও স্থানীয় সংস্থাসমূহের কাছে হস্তান্তর হলে তাকে বিকেন্দ্রীকরণ বলা হয়।

বিকেন্দ্রীকরণব্যবস্থায় প্রশাসনিক জটিলতা দূর হয় এবং সর্বাধিক জনকল্যাণ সাধিত হয়।

বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায় ।

৬। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা : সমাজের সব স্তরের মানুষের চাহিদা, আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে গণমাধ্যমের সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে ।

এক্ষেত্রে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া সরকারকে নাগরিক সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে সজাগ করে দেয় এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পথও উন্মোচন করে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত হয়।

৭। শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা : সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতে শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গড়ে তোলার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা যায়।

স্থানীয় সরকারব্যবস্থা স্থানীয় জনগণের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে নিয়োজিত থাকে।

এ জন্য স্থানীয় সরকারের হাতে রাজস্ব আয়ের ক্ষমতা প্রদান, বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ প্রদান, স্থানীয় সরকার

প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দক্ষ, শক্তিশালী ও জনকল্যাণমুখী করা প্রয়োজন ।

১৮। যোগ্য নেতৃত্ব : সঠিক দিকনির্দেশনাই পারে জাতিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ ও যোগ্য নেতৃত্ব।

দৃঢ়চেতা, নীতিবান, দক্ষ নেতার নেতৃত্বে রাষ্ট্র উন্নয়ন ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যায়। জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।

৯ । দুর্নীতি প্রতিরোধ : দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা যায়। দুর্নীতি দূরীকরণে সরকার ও নাগরিক সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

দুর্নীতি দূরীকরণে নিম্নোক্ত উপাদানগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে :

(ক) শক্তিশালী দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন;

(খ) নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা;

(গ) ব্যাপক গণসচেতনতা;

(ঘ) কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা:

(ঙ) দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

১০। আমলাদের দক্ষতা বৃদ্ধি : দক্ষ আমলাতন্ত্র সুশাসনের জন্য অপরিহার্য। আমলারা রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণ ও কর্মপরিকল্পনায় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি বৈদেশিক নীতি ও অন্য রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন।

সুতরাং আমলাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

১১। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন : রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে হিংসা, হানাহানি, মতের অনৈক্য
রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।

রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুশাসনের স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুসম্পর্ক স্থাপন করতে হবে। বিরোধী দলগুলোকে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সরকারি দলকে সহযোগিতা করতে হবে।

সরকারি দলকে বিরোধী দলের প্রতি দমন-পীড়ন নীতি বন্ধ করতে হবে। তবেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ কমবে এবং ঐক্য স্থাপিত হবে।

১২। গণমানুষের ক্ষমতায়ন : রাষ্ট্রের তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত হয় ।
তৃণমূল জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

১৩। শিক্ষার বিস্তার : শিক্ষিত জনগোষ্ঠী জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। শিক্ষিত জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে
অবদান রাখে।

শিক্ষাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে সর্বস্তরের মানুষের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষা সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ গঠনে সহায়তা করে। সুশাসনের যথার্থতা ও মর্মার্থ শিক্ষার মাধ্যমে আয়ত্ত করা সম্ভব। তাই রাষ্ট্রে শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে সুশাসন ত্বরান্বিত করতে হবে।

১৪ । মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা : রাষ্ট্রের সব শ্রেণির মানুষের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা সুশাসন নিশ্চিত করে।

দুর্বল ও অসহায়দের উপর জুলুম, নির্যাতন, অত্যাচার, অন্যায়ভাবে পুলিশি হয়রানি করা ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘন জনমনে অস্থিরতা, উদ্বেগ সৃষ্টি করে ।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে

১৫। সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থা : গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল কেন্দ্রে অবস্থান করে নির্বাচন ও নির্বাচনপ্রক্রিয়া।

সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনব্যবস্থা পরিচালনা করার মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা যায়।

এক্ষেত্রে দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ।

১৬। গণতন্ত্রের চর্চা : রাষ্ট্রব্যবস্থায় সর্বস্তরে গণতন্ত্রের চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে সুশাসন ত্বরান্বিত হয়।

গণতন্ত্র মানবাধিকার, আইনের শাসন, নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা, স্বাধীন গণমাধ্যম ও শক্তিশালী সুশীলসমাজ গড়ে তোলে।

সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সুষ্ঠু গণতন্ত্রের বিকাশ রাষ্ট্রের উন্নয়ন, গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও
সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করে ।

১৭। নারীর ক্ষমতায়ন রাষ্ট্রের সব শ্রেণির জনগণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ সুশাসনের সহায়ক। রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ-প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সমাজব্যবস্থায় তাদের উন্নততর অবস্থান সুশাসনের পথ সুগম করে। কাজেই রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর অর্থনৈতিক,

সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও সুশাসনের বাস্তবায়ন হবে।

১৮। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি : সুশাসন মূলত একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া।

রাষ্ট্রে বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে প্রশাসনের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়।

উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি পেলে জনগণের দায়িত্বশীলতা ও গণতান্ত্রিক চর্চার বিকাশ ঘটে।

তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯। নাগরিক সচেতনতা সৃষ্টি : সুশাসন প্রতিষ্ঠায় নাগরিকদের সচেতনার কোনো বিকল্প নেই।

নাগরিকগণ যদি সচেতন হন তাহলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজ সহজ হয়ে যায়। এ জন্য নাগরিকদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার করতে হবে।

কারণ শিক্ষার মাধ্যমে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। সুশাসনের অন্যতম শর্ত হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, একজন সচেতন নাগরিকই পারেন কাজটি সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে।

তাই নাগরিকগণ যদি নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন হন, তবে তাদের পক্ষে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।

২০। জনকল্যাণমুখী সেবা : সুশাসন প্রতিষ্ঠার সমস্যা সমাধানে জনকল্যাণমুখী সেবার প্রসার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

জনগণের সেবায় নিত্য নতুন কর্মসূচি হাতে নেওয়া জরুরী। কেননা জনগণ স্বল্প সময়ে এবং কম খরচে অধিকতর উন্নতমানের সেবা পেতে চায়।

এ বিষয়টি লক্ষ রেখে জনকল্যাণমুখী সেবা কার্যক্রম প্রদানের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।