সুশাসন কি? ( Good Governance);

0
935

Good Governance:

সুশাসন কি:

সারাবিশ্বে গভর্ন্যান্স ইস্যুটি নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উন্নয়নের নীতি-কৌশল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

গভর্ন্যান্সের ধারণাটি সরাসরিভাবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের উন্নয়নপ্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার সাথে সম্পৃক্ত।

সাধারণভাবে গভর্ন্যান্স বলতে বোঝায় জাতীয় কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহার।

সাম্প্রতিক সময়ে গভর্ন্যান্স বলতে বোঝায় স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে

নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক উন্নয়ন, সর্বোপরি যা মানবকল্যাণ ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান গভর্ন্যান্স সম্পর্কে বলেন, “Governance is such a concept where authorities exercise for the organizational management of sustain development.”

অর্থাৎ, “শাসন হলো এমন একটি প্রত্যয় যেখানে কর্তৃপক্ষ টেকসই উন্নয়নের জন্য সুসংগঠিত ব্যবস্থাপনা অনুশীলন করে।”

মূলত গভর্ন্যান্স হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ব অর্জন, ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা। বিশ্বব্যাংক গভর্ন্যান্স-এর তিনটি স্বতন্ত্র দিক উল্লেখ করেছে।

যথা :

১। রাজনৈতিক ব্যবস্থার ধরন (The form of the political regime),

২। উন্নয়নের জন্য একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রক্রিয়া

(The process by which authority is exercised in the management of a country’s economic and social resources for development),

নীতিমালার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের সক্ষমতা

(The capacity of governments to design, formulate and implement policies and discharge functions) | যেহেতু ‘গভর্ন্যান্স’ (Governance)

শব্দের অর্থ শাসন, তাই এ গভর্ন্যান্স বা শাসনের সাথে ‘সু’ প্রত্যয়টি যুক্ত হয়ে ‘সুশাসন’ শব্দটি সৃষ্টি হয়েছে।

আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, সুশাসন বিশ্বব্যাংকের দ্বারা উদ্ভাবিত এবং অগ্রসরমান একটি ধারণা।

সুশাসনের লক্ষ্য হলো সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত তথা সার্বিক উন্নয়ন।।

সম্পর্কে Harris বলেন, “সুশাসন এমন এক সর্বজনীন ভূমিকা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজের ধারা, যা নিজ থেকেই নিয়মকানুন ও সেগুলোর কার্যকারিতার সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণ করে।”

G. Bilne (জি. বিলনে)-এর মতে, “Good Governance is the effective management of a country’s social and economical resources in a manner that is open, transparent, accountable and equitable.”

সাবেক জাতিসংঘ মহাসচিব Kofi Annan (কফি আনান) বলেন, “Good Governance is ensuring respect for human rights and the rule of law, strengthening democracy, promoting transparency and capacity in public administration.”

অর্থাৎ, “সুশাসন মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধা নিশ্চিত করে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, লোকপ্রশাসনের স্বচ্ছতা ও সক্ষমতা প্রবর্তন করে।”

আবার, মার্কিন অর্থমন্ত্রী Paul O’Neil বলেন,
“Good Governance means ruling justly, enforcing laws and contracts fairly, respecting human and property rights and fighting corruption.”

অর্থাৎ, “সুশাসন হলো ন্যায়সংগত শাসন, আইন ও চুক্তির নিরপেক্ষ প্রয়োগ, মানবাধিকার ও সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং দুর্নীতির
বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা।

মূলত সুশাসন হলো এমন শাসনব্যবস্থা যেখানে রাষ্ট্রের জনসম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নত নাগরিক সেবাদান সম্ভব হয়।

সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্সের উপাদান হিসেবে যেসব বিষয় বিবেচনা করা হয় সেগুলো হলো- স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, গণতন্ত্র, বিকেন্দ্রীকরণ, আইনের শাসন ইত্যাদি।

জাতিসংঘের উন্নয়ন প্রোগ্রাম (UNDP) টেকসই মানবিক উন্নয়নের রিপোর্টে সুশাসনের কতগুলো বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছে।

সেগুলো হলো-

১. অংশগ্রহণ (Participation);

২. আইনের শাসন (Rule of Law);

৩. স্বচ্ছতা (Transparency); ৪. সংবেদনশীল (Responsiveness);

৫. ঐকমত্য (Consensus Oriented);

৬. সমতা (Equity);

৭. দক্ষতা (Efficiency);

৮. জবাবদিহিতা (Accountability);

৯. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য (Specific Goal)।
Organization for Economic Cooperation and Development (OECD), ‘Good Governance is established when public institutions act efficiently, providing an enabling environment for economic growth and development.

Good Governance requires the improvement of accountability and transparency of public sector agencies, concomitant with the effective fight against corruption.

The effective performance of democratic institutions, including legislatures and the fight against corruption are central elements of Good Governance.’

(যখন সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ দক্ষতার সাথে কাজ করে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের জন্য সহায়ক পরিবেশ প্রদান করে তখন সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার উন্নয়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ সুশাসনের জন্য আবশ্যক।

আইনসভাসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যকর ভূমিকা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ হলো সুশাসনের প্রধান উপাদান।)

OECD-এর অঙ্গসংগঠন Development Assistant Committee (DAC) সুশাসনের কতিপয় ক্ষেত্র উল্লেখ করেছে। book)
সেগুলো হলো—

১। গণতান্ত্রিক ও মুক্ত বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থার প্রসার ।

২। স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, সুদক্ষ ও কার্যকর জাতীয় ও স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ ।

৩। মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ।
ন্যায্য ও প্রবেশগম্য আইন এবং বিচারব্যবস্থায় আইনের শাসন জোরদারকরণ ।

৫। স্বাধীন গণমাধ্যম ও তথ্য বিতরণব্যবস্থা ত্বরান্বিত করা।

৬। দুর্নীতি দমন ।

৭। অতিরিক্ত সামরিক খরচ কমানোর প্রচেষ্টা
সুশাসন সম্পর্কে বিভিন্ন ধারণা ও মতামত পাওয়া গেছে।

তবে এগুলোর মধ্যে Asian Development Basic Report-
এ সুশাসন সম্পর্কিত কিছু প্রশ্নের স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় ।
যেমন :

১। জনগণ কি সম্পূর্ণভাবে শাসনে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম?

২। জনগণ কি সব তথ্য সম্পর্কে জানে?

৩। সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা কি জনগণের কাছে দায়ী থাকে?

৪। শাসনকার্যে নারী ও পুরুষের অংশগ্রহণ কি সমান?

৫। দরিদ্রদের চাহিদা পূরণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হয় কি?

৬। মানবাধিকার কি নিশ্চিত হয়?

পৌরনীতি ও সুশাসন : প্রথম পত্র

৭। বর্তমানে প্রণয়নকৃত নীতিমালায় কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়?

৮। শাসনের কাঠামোকে কি জনগণ নিজের মনে করে?

সুতরাং স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, সুশাসন হলো একটি অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়া,

যেখানে সমাজের সবার অধিকার ভোগের সুযোগ থাকে, সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়, সরকারি কার্যক্রমে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে।

দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, বিরোধী দলের কথা বলার সুযোগ প্রদান, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বিধানের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতি সদা আন্তরিক সরকার- গোষ্ঠী নিয়ে সুশাসন ।

সুশাসনের উদ্দেশ্য : সুশাসন হলো জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সমর্থিত আইনের মাধ্যমে পরিচালিত শাসনব্যবস্থা। এটি সবার কাম্য শাসনব্যবস্থা।

রাষ্ট্রের সব স্তরের উন্নয়নের জন্য সুশাসন সহায়ক। নিচে সুশাসনের উদ্দেশ্যসমূহ উল্লেখ করা হলো-

১। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সবার সমান অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।

২। রাষ্ট্রের আইন ও নীতিমালার অধীনে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করা।

৩। স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিকেন্দ্রীকৃত সরকারব্যবস্থা গড়ে তোলা ।

৪ । দারিদ্র্য দূরীকরণের লক্ষ্যে বাজেট প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পরীক্ষণ।

৫। রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও জনকল্যাণে সর্বাধিক সুবিধা প্রদান করা।

৬। সমতাভিত্তিক সমাজ নির্মাণ করা।

৭। রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।

৮। রাষ্ট্রের কার্যাবলির উপর অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ অপশক্তির কৌশল দমন করা।

৯। সব ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিহত করা।

১০। মানবসৃষ্ট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশ রক্ষা, ভারসাম্যমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে ‘বাসযোগ্য
পথিবী’ গড়ে তোলা ।