সুশাসনের বৈশিষ্ট্যসমূহ ( Features of Good Governance):

0
169

সুশাসন একটি দক্ষ ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা, যেখানে নাগরিক ও দল তথা জনগণ তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করতে পারে, তাদের অধিকার আদায় এবং চাহিদা পূরণ করতে পারে।

আধুনিক রাষ্ট্রের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো জনকল্যাণ সাধন করা। আর এর জন্য সুশাসন একান্ত প্রয়োজন।

কেননা, সুশাসন দেশের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের অধিক সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে।

সুশাসনের লক্ষ্যই হলো দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গঠনের মাধ্যমে মানবাধিকার সংরক্ষণ ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়ন।

অর্থাৎ, একটি দেশ বা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত উন্নয়নের জন্য সুশাসন অপরিহার্য।

এ সুশাসনের ধারণা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর কতিপয় বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। নিচে উক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ ধাপে ধাপে আলোচনা করা হলো-
১। অংশগ্রহণ : সুশাসনের ভিত্তি হলো ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে শাসনব্যবস্থায় সব নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ।

অংশগ্রহণ সুশাসনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় নীতিনির্ধারণ ও এগুলোকে বাস্তবে রূপদান করতে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়।

এসব কর্মসূচির দায়িত্ব জনগণের মধ্যে সুষমভাবে বণ্টন করে দেওয়াকে অংশগ্রহণ বলে।

জনগণের এ অংশগ্রহণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উভয়ভাবেই হতে পারে। তবে বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে জনগণ পরোক্ষভাবে শাসনকাজে অংশগ্রহণ করে।

তারা বিভিন্ন দল, স্বার্থগোষ্ঠী, সংগঠন, নির্বাচিত প্রতিনিধি ইত্যাদির মাধ্যমে এ সুযোগ লাভ করে।

শাসনপ্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ সুশাসনকে গতিশীল করার পাশাপাশি জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।

অন্যথায় শাসনকাজে জনগণের অংশগ্রহণের বাধাগ্রস্ততা সুশাসনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হবে।

২। আইনের শাসন : আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সুশাসনের অপরিহার্য শর্ত। কেননা আইনের শাসন ব্যতীত রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়;

বরং তা রাষ্ট্রশাসকদের স্বেচ্ছাচারিতায় বন্দি হবে। আইনের শাসন হলো আইনকে প্রাধান্য দিয়ে আইনানুযায়ী সবাইকে সমানভাবে শাসন করা।

আইন অনুযায়ী কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।

রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে নাগরিকরা সমান সুযোগ-সুবিধা, অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করবে।
রাষ্ট্রে সর্বদা শান্তি-শৃঙ্খলা বিরাজ করবে।

৩। স্বচ্ছতা : স্বচ্ছতা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। স্বচ্ছতা জনগণের প্রতি অন্যায় ও রাষ্ট্রে দুর্নীতির আশঙ্কা কমায়।

শাসনপ্রক্রিয়ার আইনকানুন, নীতি বা সিদ্ধান্তে স্বচ্ছতা এলে জনগণ সহজেই তা বুঝতে পারে।
স্বচ্ছতার কারণে সরকার ও জনগণের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি হয় না এবং সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে।
তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত করে রাষ্ট্রে স্বচ্ছতা আনা যায়।
এ স্বচ্ছতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করে।

৪। জবাবদিহিতা : সুশাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জবাবদিহিতা।
এটি সুশাসনের মূল চাবিকাঠি।

নিজ কর্ম সম্পর্কে অন্যের কাছে ব্যাখ্যা প্রদান বা কর্মের পেছনে কারণ প্রদর্শন করার বাধ্যতাকে জবাবদিহিতা বলে ।

জবাবদিহিতা স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি রোধ করে। তাই জবাবদিহিতা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমে এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত হয়।

৫। দায়িত্বশীলতা : সরকার ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি দায়িত্বশীলতা সুশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

সরকারের দায়িত্বশীলতার উপর সুশাসন অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জনগণের পরিসেবা করার প্রয়াস ।

৬। দক্ষতা : সুশাসনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো কার্যকারিতা ও দক্ষতা। এর অর্থ হলো এমন প্রতিষ্ঠান ও কর্মপ্রক্রিয়া স্থাপন করা,

যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের চাহিদা পূরণে সক্ষম হয়। সুশাসনের ক্ষেত্রে দক্ষতা হচ্ছে প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার করা এবং পরিবেশ রক্ষা করা।

৭। সার্বিক কল্যাণসাধন : সুশাসনের মূল উদ্দেশ্যই হলো জনসমাজের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা।

আর এ কল্যাণ তখনই নিশ্চিত হবে যখন জনগণের মনে বিশ্বাস আসবে যে তারা সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়; বরং তারাই সমাজের মূল।

এজন্য সমাজের সবার জন্য বিশেষত যারা সমাজে সবচেয়ে অসহায় তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য ন্যায়পরায়ণতার সাথে সর্বব্যাপী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন প্রয়োজন, যাতে করে সবার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়।

পৌরনীতি ও সুশাসন:

৮। ঐকমত্য : সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ থাকে। তাদের মতামতও ভিন্ন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এসব ভিন্ন মতাদর্শিক মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রয়োজন।

আর সমাজের মধ্যস্থতার মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য বজায় রাখা সুশাসনের বৈশিষ্ট্য। সমাজের স্বার্থে সুশাসন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়,

এবং মতামতে সংঘর্ষ দূরীকরণে এমনভাবে কাজ করে, যাতে কেউ ক্ষতির সম্মুখীন না হয় ।

৯। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা : সুশাসনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা।

বিচার বিভাগ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে। এটি সংবিধানের রক্ষাকবচ। তাই বিচার বিভাগকে হতে হবে স্বাধীন, সরকারের অন্য বিভাগের প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ।

জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচার বিভাগ ব্যতীত কোনো বিকল্প পথ নেই।

১০। সরকারের বৈধতা : সুশাসনের ক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই বৈধ হতে হবে। কারণ সরকার স্থিতিশীল ও বৈধ না হলে সুশাসন সম্ভব নয়।

অবৈধ সরকার স্বেচ্ছাচারী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়।
সামরিক ও অগণতান্ত্রিক শাসন ‘কখনোই সুশাসন হতে পারে না।

সরকারের বৈধতা ও অবৈধতার প্রশ্ন সুশাসনকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে ।

১১। জনসন্তুষ্টি : রাষ্ট্রের উন্নয়নের প্রধান শর্তই সুশাসন। আর এ সুশাসন পরিমাপের যন্ত্র রাষ্ট্রের জনগণ।

অর্থাৎ, সুশাসনে বিচারের মানদণ্ড হলো রাষ্ট্রীয় জনগণের সন্তুষ্টি। রাষ্ট্রের জনগণ যে শাসনে সন্তুষ্ট নয় বা যে শাসনব্যবস্থা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য,

সেটিকে কোনোভাবেই সুশাসন বলা যায় না। তাই রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও চাহিদা পূরণের মাধ্যমে তাদের সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হতে হয়।

এ ছাড়াও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সততা, লিঙ্গবৈষম্যের অবসান, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশাসনের সেবাধর্মী মনোভাব,

নৈতিক মূল্যবোধ ও নিরপেক্ষতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, সুশীলসমাজের ভূমিকা, গণতান্ত্রিক মনোভাব, নিয়ম-শৃঙ্খলা ও কর্তব্যপরায়ণতা ইত্যাদি।

এসবের সমন্বয় রাষ্ট্রে সুশাসনের বীজ বপন করতে পারে। উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, সুশাসন এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে সুখী ও সমৃদ্ধ মানবসমাজ গঠন করা যায়।

তবে পৃথিবীর খুব কম রাষ্ট্রই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। কেননা, সুশাসন সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করা যেকোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই কষ্টসাধ্য কাজ।

তবে শাসক ও শাসিত সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং লক্ষ্যার্জনের অটুট মনোভাব থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার এ কষ্টসাধ্য কাজটি সহজ করে সমাজ, রাষ্ট্র ও দেশের সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব।