সুশাসনের ধারণা ( Concept of Good Governance):

বর্তমান বিশ্বের একটি আধুনিক ও জনপ্রিয় ধারণা হলো সুশাসন।

সুশাসন রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন তথা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত।

সভ্যতার ক্রমবিকাশ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে রাষ্ট্রের শাসনকাঠামোতে আসা পরিবর্তনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উন্নয়ন কৌশল হিসেবে সুশাসন প্রত্যয়টির আবির্ভাব ঘটেছে।

‘সুশাসন’ ধারণাটি বিশ্বব্যাংকের উদ্ভাবিত। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় ‘সুশাসন’ প্রত্যয়টি সর্বপ্রথম ব্যবহার করা হয়।

এতে উন্নয়নশীল দেশের অনুন্নয়নের কারণ চিহ্নিত করে বলা হয় যে, সুশাসনের অভাবের কারণেই এরূপ অনুন্নয়ন ঘটেছে।

বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে সুশাসন ধারণাটি জনপ্রিয় হয়। সুশাসনের লক্ষ্য হলো জবাবদিহিমূলক প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এটি আধুনিক রাষ্ট্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুশাসন প্রত্যয়টি পৌরনীতির একটি নতুন সংযোজন।

সুশাসনের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Good Governance’।

অর্থাৎ, সুশাসন— ‘Good’, যার অর্থ ‘সু’ এবং ‘Governance’, যার অর্থ ‘শাসন’- এ দুটি প্রত্যয়ের সমন্বয়ে গঠিত।

তাই সুশাসনকে স্পষ্টভাবে বুঝতে হলে Governance বা শাসন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে ।

Governance একটি বহুমাত্রিক ধারণা। এ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ ‘gubernan’ থেকে, যার অর্থ জাহাজ পরিচালনা করা।

সাধারণত Governance বা শাসন এমন একটি পদ্ধতিকে বোঝায়, যেখানে একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোনো সংস্থা, সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি নির্ধারণ করা হয়।

প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহাবুবুর রহমান বলেছেন, “Governance is such a concept when authorities exercise for the organizational management to sustain development.”


“রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার ব্যবহার করাকে শাসন বলে,

Pierre Landell – Mills and Ismail Serageldin তাঁদের ‘Governance and the Eternal Factor’
গ্রন্থে বলেছেন

মধ্যে জনগণের সুষ্ঠু চাহিদা এবং তাদের বৈধ অধিকার উপভোগের বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত থাকে।”

Governance শুধু রাজনৈতিক শাসন নয়; এটি স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিকও হতে পারে।

সুতরাং সংগঠন পরিচাল প্রক্রিয়া, লক্ষ্য অর্জন প্রক্রিয়া ও সংগঠন কাঠামোর সমন্বিত রূপকে Governance বলা হয়।

সুশাসন হচ্ছে Governance এর ইতিবাচক রূপ।
সুশাসন বলতে এমন এক ধরনের শাসনব্যবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে শাসক শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার বিভাগ এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে।

The Social Encyclopaedia-তে সুশাসন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, “It is a broader concept than governmen which is specially concerned with the role

of political authorities in maintaining social order within defined territory and the exercise of executive power.”

অর্থাৎ, “এটি সরকার পরিচালনার চেয়ে একটি বিস্তৃত ধারণা, যা একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ও নির্বাহী ক্ষমতা চর্চায় রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকার সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।”

UNDP (United Nations Development Programme)-, “Good governance is the exercise of economical, political and administrative authority to manage a country’s affair at all levels.”

অর্থাৎ, “সুশাসন হলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের চর্চা, যার মাধ্যমে একটি দেশের সব স্তরের কার্যাবলি পরিচালনা করা যায়।”

ড. মহব্বত খানের মতে, “সুশাসন হলো একটি দেশের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সম্পদের কার্যকর ব্যবস্থা,
তবে ব্যবস্থাটি হবে উন্মুক্ত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায্য সমতাপূর্ণ।”

বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, “Good governance is the manner in which power is exercised in the management of country’s economic and social resources for development.”

অর্থাৎ, “সুশাসন হলো এমন একটি কর্মপ্রক্রিয়া, যেখানে একটি দেশের উন্নয়নের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়।”

সুশাসন Feat
সুশাস করতে সাধন
জনগন
গঠনে
রাজনৈতি

The Oxford English Dictionary অনুযায়ী, “শাসনপদ্ধতি, শাসনের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব, ব্যবস্থাপনা কৌশল এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে সুশাসন বলা হয়।”

Landell Mills-এর মতে, “উত্তম শাসনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি অন্তর্নিহিত ভাষা ও আচরণ কাঠামো হলো সুশাসন।”

81
Professor Dr. Ataur Rahman 4, “Good governance implies the ability of political system, it’s effectiveness, performance and quality.”

অর্থাৎ, “সুশাসন রাজনৈতিক ব্যবস্থার সক্ষমতা, এর ফলপ্রসূতা, কার্যসম্পাদন ও বৈশিষ্ট্যমূলক গুণকে ইঙ্গিত করে।”

সুশাসনের গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা প্রদান করেছেন ম্যাককরনি (MacCorney)। তিনি বলেছেন,

“Good governance is the relationship between civil society and state, between government and governed, the ruler and ruled.”

অর্থাৎ, “সুশীলসমাজ ও রাষ্ট্র, সরকার ও শাসিত জনগণ, শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্ককে সুশাসন বলে।”

উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, সুশাসন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া, যেটি সমাজের মানুষের চাহিদার সাথে রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের সমন্বয় রক্ষা করে।

অন্যভাবে বলা যায়, সুশাসন হলো একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যা দায়িত্বশীলতা, স্বচ্ছতা, আইন কাঠামো এবং অংশগ্রহণের উপর নির্ভরশীল।

সুশাসনের মৌলিক কাজ হলো রাষ্ট্রকে দুর্নীতিমুক্ত করে সেখানে ন্যায়পরায়ণতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।