সরকারব্যবস্থা কি বা বিভিন্ন প্রকার সরকারব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

0
46

বিভিন্ন প্রকার সরকারব্যবস্থা Different Types of Government
গণতন্ত্র
Democracy:

বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্র একটি জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা। গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন।

অর্থাৎ, যে শাসনব্যবস্থায় জনগণের হাতে ক্ষমতা থাকে তাকেই গণতন্ত্র বলে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র একটি অতি প্রাচীন ধারণা হলেও আধুনিক সরকারব্যবস্থায় এটি সর্বজনবিদিত একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা।

প্রাচীন গ্রিসে সর্বপ্রথম গণতন্ত্র ধারণার উদ্ভব হয়। গণতন্ত্রের ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো ‘Democracy’।

‘Demos’ এবং ‘Kratia’ এ দুটি গ্রিক শব্দের সমন্বয়ে ‘Democracy’ শব্দটি গঠিত, যেখানে ‘Demos’ শব্দের অর্থ ‘জনগণ’ এবং ‘Kratia’ শব্দের অর্থ ‘শাসন’।

ব্যুৎপত্তিগত অর্থে ‘Democracy’ হলো জনগণের শাসন।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক হেরোডোটাস প্রায় ২,৫০০ বছর পূর্বে গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নির্ধারণ করেছেন।

তিনি বলেছেন, “গণতন্ত্র এক প্রকার শাসনব্যবস্থা, যেখানে শাসনক্ষমতা কোনো শ্রেণি বা শ্রেণিসমূহের উপর ন্যস্ত থাকে না; বরং সমাজের সদস্যগণের উপর ন্যস্ত হয় ব্যাপকভাবে।”

এত বছর পূর্বে হেরোডোটাস প্রদত্ত সংজ্ঞার প্রতিফলন আজও পাওয়া যায় আধুনিককালের শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও দার্শনিকদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞায়।

যেমন- লর্ড ব্রাইস বলেছেন, “Democracy is that from of government in which the ruling of a state is legally vested, not in any particular class or classes, but in the members of the community as a whole.”

অর্থাৎ গণতন্ত্র এমন এক ধরনের সরকার যাতে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা আইনগতভাবে কোন নির্দিষ্ট শ্রেণি বা শ্রেণিসমূহের হাতে নিয়োজিত না থেকে বরং সমাজের সকল সদস্যের হাতে নিয়োজিত থাকে।

MacIver-এর মতে, “গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার জনগণের একজন প্রতিনিধি মাত্র এবং সে অনুযায়ী জনগণ সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করে।”

অস্পষ্ট হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন (Abraham Lincoln ) প্রদত্ত গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটি বিশ্বব্যাপী পরিচিত এবং সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়।

তাঁর মতে, “Democracy is a government of the people, by the people and for the people.”

অর্থাৎ, “গণতন্ত্র হচ্ছে, জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের দ্বারা পরিচালিত ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক শাসনব্যবস্থা।”

তবে গণতন্ত্র সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা প্রদান করেছেন সি. এফ. স্ট্রং।

তিনি বলেছেন, “Democracy implies that government which shall rest on the active consent of the government.”

অর্থাৎ, “শাসিতের সম্মতির উপর প্রতিষ্ঠিত সরকারব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলা যায়।”

গণতন্ত্রের সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দর সংজ্ঞা দিয়েছেন অধ্যাপক সিলি (Professor seeley)। তাঁর মতে, “Democracy is a Government in which every one has a share” অর্থাৎ,

“গণতন্ত্র এমন এক ধরনের সরকার যেখানে সকলেরই অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।”

সুতরাং বলা যায়, গণতন্ত্র হলো জনগণের মতের ভিত্তিতে জনগণ দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা। এটি একনায়কতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী শাসনব্যবস্থা।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী; তথা জনগণই সব ক্ষমতার উৎস।

বস্তুত এটি একটি দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা। বিশ্বের প্রায় সব দেশেই গণতন্ত্রকে শাসনপদ্ধতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদি প্রায় সব দেশেরই সরকারব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ।

গণতন্ত্রের প্রকারভেদ
Types of Democracy:

গণতন্ত্র হলো জনগণের দ্বারা পরিচালিত একটি জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা। গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করে।

তবে এক্ষেত্রে জনগণ সরাসরি অথবা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে।

এর উপর ভিত্তি করে গণতন্ত্রকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- ১. প্রত্যক্ষ বা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র ও ২. পরোক্ষ
প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র
Direct Democracy:

যে সরকারব্যবস্থায় জনগণ প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি রাষ্ট্রের শাসনকার্যে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা করে তাকে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র বলে।

এরূপ শাসনব্যবস্থায় জনগণই সরকারি যাবতীয় কর্মকাণ্ড সম্পাদন করে থাকে। প্রাচীন গ্রিসের নাগরিকগণ সরাসরিভাবে নগরের শাসনকার্যে অংশগ্রহণ করত।

গ্রিস ও রোমে প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থ প্রচলিত ছিল।

নাগরিকগণ নির্দিষ্ট সময়ে কোনো বিশেষ স্থানে সমবেত হয়ে আইন প্রণয়ন, রাজস্ব ও ব্যয় নির্ধারণ সরকারি কর্মচারী নিয়োগ প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদন করত।

তারা মাঝে মাঝে বিচারকার্যও সম্পাদন করত। এভাবে সমগ্র প্রশাসনিক কাজ নাগরিকগণ সরাসরি বা প্রত্যক্ষভাবে সম্পন্ন করত।

প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র কেবল ক্ষুদ্র রাষ্ট্র অর্থাৎ যেখানে জনসংখ্যা খুব সীমিত সেই রাষ্ট্রেই কাজ করতে পারে। কিন্তু বর্তমানে জাতীয় রাষ্ট্রসমূহে এ ধরনের শাসন কল্পনা করা যায় না।

আধুনিককালে কেবল সুইজারল্যান্ডের কয়েকটি ক্যান্টন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি স্থানীয় সরকার পরিচালনায় প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র প্রচলিত রয়েছে।

পরোক্ষ গণতন্ত্র
Indirect Democracy:

পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র হলো গণতন্ত্রের আধুনিক রূপ। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই পরোক্ষ গণতন্ত্র চালু রয়েছে।

এ শাসনব্যবস্থায় নির্দিষ্ট সময় অন্তর জনগণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করে এবং এ নির্বাচিত প্রতিনিধির উপরই শাসনব্যবস্থা বা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে।

অর্থাৎ জনগণ তাদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। এরূপ শাসনব্যবস্থাকে পরোক্ষ গণতন্ত্র বলা হয়।

পরোক্ষ গণতন্ত্র সম্পর্কে জন স্টুয়ার্ট মিল (John Stuart Mill) বলেছেন, “It is a form of government where the whole people or some numbers portion of them exercise the governing power though deputies periodically elected by themselves.

অর্থাৎ, “পরোক্ষ গণতন্ত্র হলো সেই রকম শাসনব্যবস্থা যেখানে সমগ্র জনগণ বা জনগণের অধিকাংশ তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনক্ষমতার ব্যবহার করে।”

পরোক্ষ গণতন্ত্রে নির্বাচনব্যবস্থাই হলো জনগণ ও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রধান যোগসূত্র।

বৃহদায়তন ও জনবহুল রাষ্ট্রে পরোক্ষ গণতন্ত্রই বিশেষ উপযোগী ও কাম্য। তবে অনেক সময় লক্ষ করা যায়, জনগণের নির্বাচিত সরকার জনগণের ইচ্ছা বা মতামতকে উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো শাসনকার্য পরিচালনা করে।

এতে সরকারের অনেক কাজ জনমতের বিরোধী হয় এবং দেখা দেয় বিদ্রোহ ও বিপ্লব।

গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য
Characteristics of Democracy:

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনগণ হলো রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার উৎস। যে কারণে বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা হলো গণতন্ত্র ।

গণতন্ত্রের যেসব বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায় সেগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

১। প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার : বর্তমানে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলতে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারকে বোঝায়।

প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার গঠন গণতন্ত্রের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বর্তমান রাষ্ট্রগুলো বৃহদায়তন এবং জনসংখ্যা ব্যাপক।

এ কারণে সব জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণপূর্বক শাসনকার্য পরিচালনা সম্ভবপর হয় না।

ফলে বর্তমানে প্রতিনিধিত্বমূলক বা পরোক্ষ গণতন্ত্রের সৃষ্টি হয়েছে।

২। সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন : গণতন্ত্রের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।

গণতন্ত্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সবাই শাসনকার্য পরিচালনা করার সুযোগ পায় না। সাধারণত নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দলের মধ্যে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে সে দলের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের নিয়ে সরকার গঠিত ও দেশ পরিচালিত হয়।

তাই বলা হয়, গণতন্ত্র জনগণের সমগ্র অংশের নয়, সংখ্যালঘিষ্ঠেরও নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের শাসন মাত্র ।

৩। জনমতের প্রাধান্য : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা জনমতের প্রাধান্যের উপর প্রতিষ্ঠিত। গণতন্ত্রে জনমতকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না।

জনমতের উপর নির্ভর করে গণতান্ত্রিক সরকারের স্থায়িত্ব। জনমত হলো গণতন্ত্রের আত্মাস্বরূপ।

আত্মা ছাড়া মানুষ যেমন বাঁচতে পারে না, তেমনি জনমত ব্যতীত সরকার টিকে থাকতে পারে না।

৪। দায়িত্বশীল শাসনব্যবস্থা : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সরকার তার যাবতীয় কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনগণের কাছে দায়ী থাকে।

বিশেষত সংসদীয় গণতন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার আইনসভার কাছে জবাবদিহি করে এবং আইনসভার আস্থা হারালে সরকারের পতন ঘটে।

৫। বহুদলীয় ব্যবস্থা : গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বহুদলীয় ব্যবস্থা।

পরোক্ষ গণতন্ত্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকে। রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের সমর্থন লাভের চেষ্টা করে থাকে।

নির্বাচনে যে দল জয়লাভ করে সে দল সরকার গঠন করে। যেসব দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারে না তারা সরকারের বাইরে থেকে গঠনমূলক বিরোধিতা করে সরকারকে সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকে।

৬। আইনের শাসন : গণতন্ত্রে আইনের শাসনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। এখানে আইনের চোখে সবাই সমান মর্যাদা ভোগ করে ।

জাতি-ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবাইকে আইনের অনুশাসন মেনে চলতে হয়।

৭। নির্বাচনব্যবস্থা : আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নির্বাচনব্যবস্থা।

নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণ তাদের প্রতিনিধিদের বাছাই করে থাকে। এ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই শাসনকার্য পরিচালনা করে থাকে। নির্বাচন হচ্ছে
গণতন্ত্রের বাহন।

৮। রাজনৈতিক সাম্য : রাষ্ট্রের শাসনকার্যে সকলের অংশগ্রহণের সমান সুযোগ-সুবিধাই হচ্ছে রাজনৈতিক সাম্য।

এই রাজনৈতিক সাম্যের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়।

এক্ষেত্রে নির্বাচন করা বা নির্বাচিত হওয়ার ব্যাপারে সবাই সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে। এখানে অর্থনৈতিক, ধর্মীয়, বর্ণগত কোনো ধরনের বৈষম্য থাকে না।

অর্থাৎ রাষ্ট্রের দিক থেকে সবাই সমান ক্ষমতার অধিকারী।

৯। স্বাধীন প্রচারমাধ্যম : গণতন্ত্রে প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা স্বীকৃত।

প্রচারমাধ্যমগুলোর স্বাধীনতা সুষ্ঠু জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

প্রচারমাধ্যমে সরকারের কর্মকাণ্ড প্রচারের পাশাপাশি এ বিষয়ে জনগণের প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয় ।