মূল্যবোধ কি?

0
1641

পাঠ-৩.১ : মূল্যবোধ Values

‘মূল্যবোধ’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Values’। মূল্যবোধ সামাজিক রীতিনীতি ও বিধিবিধানের সমষ্টি।

মূল্যবোধ হলো সমাজের মানুষের মৌলিক বিশ্বাস, যা মানুষের নীতি ও চিন্তা-চেতনার মানদণ্ড এবং যা মানুষকে ভালো-মন্দ, ন্যায়- অন্যায় বিবেচনা করতে সহায়তা করে।

অনেকের মতে, মূল্যবোধ গভীরভাবে মানুষের নীতিবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়। মূল্যবোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি প্রত্যেক মানুষের সমাজ ও সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত।

মূল্যবোধের মাধ্যমে একটি জাতির চিন্তা-চেতনা, আচার-আচরণ, কাজের প্রতি নিষ্ঠা, সততা, ন্যায়বোধ ইত্যাদি পরিস্ফুটিত হয়ে ওঠে।

মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি নিজ দেশ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

সমাজের মানুষের শৃঙ্খলা, ধৈর্য, সম্মানবোধ, কঠোর পরিশ্রম, আত্মনির্ভরশীলতা, সাহস ও সততার মূল্যবোধ আত্ম-উন্নয়ন ও সামাজিক উন্নয়নের মূলশক্তি ।

মূল্যবোধের ধারণা ও সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বিভিন্ন সমাজবিজ্ঞানী বিভিন্ন ধরনের মতামত দিয়েছেন।

নিচে মূল্যবোধের
কতিপয় সংজ্ঞা প্রদান করা হলো :

এইচ. ডি. স্টেইন (H. D. Stain)-এর কথায়, “জনগণ যার সম্বন্ধে আগ্রহী, যা তারা কামনা করে, যাকে তারা অত্যাবশ্যক বলে মনে করে, যার প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধা এবং যা করতে তারা আনন্দ পায় তাকে মূল্যবোধ বলে।”

এইচ. এম. জনসন (H. M. Johnson)-এর মতে, “Values are general standards and may be regarded as higher order norms.”

অর্থাৎ, “মূল্যবোধ সাধারণ মানদণ্ড এবং ইচ্ছাশক্তির রীতিনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়।”

সমাজবিজ্ঞানী এম. আর. উইলিয়াম (M. R. William)-এর মতে, “মূল্যবোধ মানুষের ইচ্ছার একটি প্রধান মানদণ্ড, যার আদর্শে মানুষের আচার-ব্যবহার ও রীতিনীতি নিয়ন্ত্রিত হয়।

এ মানদণ্ডের দ্বারা সমাজে মানুষের ভালো-মন্দ বিচার করা হয়। “

এম. ডব্লিউ. পাম্পফ্রে (M. W. Pumphrey) বলেন, “Values are abstract formulations or prescriptions for preferred behaviour held in common by social groups.”

অর্থাৎ, “সামাজিক দলের প্রত্যাশিত আচরণের বিমূর্ত সুবিন্যস্ত প্রকাশ বা বিধানই হলো মূল্যবোধ।”

সমাজবিজ্ঞানী মেটা স্পেন্সারের (Meta Spencer) মতে, “Values are the Standard used to judge behaviour and to choose among various possible goals.”

অর্থাৎ, “মূল্যবোধ হলো একটি মানদণ্ড, যা আচরণের ভালো-মন্দ বিচারের এবং সম্ভাব্য বিভিন্ন লক্ষ্য থেকে কোনো একটি পছন্দ করার ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়।”

যেসব সমাজের প্রথা ও সামাজিক মূল্যবোধ জীবনের মহত্তম বিকাশের পথকে এগিয়ে নিয়ে যায় সেসব সমাজের সামাজিক মূল্যবোধগুলো তত বেশি উন্নত।

ব্যক্তিগত নিষ্ঠা, কঠোর পরিশ্রম করার অদম্য মানসিকতা, উন্নয়নের স্বার্থে অভিন্ন লক্ষ্য, আত্মনির্ভরশীলতা, সমাজের বঞ্চিত মানুষের প্রতি সহানুভূতির দৃষ্টিভঙ্গি ইত্যাদি মূল্যবোধ সব মানুষের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে সমাজব্যবস্থায় স্থিতি লাভ করে ।

উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলোর বিশ্লেষণে বলা যায়, মূল্যবোধ মানুষের সামাজিক রীতিনীতি ও আচার-আচরণের সমষ্টি, যা সমাজ ও সংস্কৃতির ধারক।

এটি সমাজ, কৃষ্টি ও ঐতিহ্য, শিক্ষা, ধর্ম ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। মানুষ তার চাহিদা, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা, শখ ইত্যাদি কীভাবে পূরণ করবে, মূল্যবোধ তা নির্ধারণ করে দেয়।

এটি জীবনকে অর্থপূর্ণ করে। ব্যক্তিবিশেষে মূল্যবোধের গুরুত্ব বিবেচনার ক্ষেত্রে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
আবার মানুষের চাহিদা ও অভিজ্ঞতার সাথে সাথে মূল্যবোধের পরিবর্তন হয়। মূল্যবোধই ব্যক্তিকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে তোলে