প্রশ্ন : ৮.৭। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা কর ।অথবা, মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনার মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে লিখ।

0
23

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক সম্পর্কে বিস্তারিত:

উত্তর : ভূমিকা : পূর্ব পাকিস্তান তথা সমগ্র পাকিস্তানে যখন চরম রাজনৈতিক অচলাবস্থা বিরাজমান তখন ১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধুর সাথে আলোচনা করতে। আপাতদৃষ্টিতে আলোচনার উদ্দেশ্য হলো সংকট থেকে পরিত্রাণ লাভ করা। আর একমাত্র এ ধরনের রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই পাকিস্তানকে রক্ষা করা যেতে পারে— এ ধারণা দেশের সর্বত্র অতিদ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সকলের দৃষ্টি তাই মুজিব-ইয়াহিয়ার আলোচনার দিকে ।

মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক : বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের মধ্যে কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। নিম্নে এসব বৈঠক সম্বন্ধে আলোচনা করা হলো :

১. ১৬ মার্চের মুজিব-ইয়াহিয়ার প্রথম বৈঠক : শেখ মুজিব ও ইয়াহিয়া খানের প্রথম বৈঠক হয় ১৬ মার্চ, ১৯৭১ সালে। বৈঠকটি শুরু হয় বেলা এগারোটায় আর শেষ হয় বেলা দেড়টায়। শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে আসলে সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। প্রেসিডেন্টের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রেসিডেন্টের সাথে তার আলোচনা হয়েছে। প্রথম দিনের আড়াই ঘণ্টার আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ও শেখ মুজিবের কোনো সহকারী ছিল না; বরং একান্তে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সম্ভবত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সেনাবাহিনীকেও ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। ১৭ মার্চ বিবিসির এক সংবাদ বুলেটিনে প্রচার করা হয় যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের শাসনতান্ত্রিক ও আইনগত দিক সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়ার জন্য বিচারপতি এ. আর. কর্নোলিয়াস ঢাকায় এসেছেন। ঐ দিনই মওলানা ভাসানী বলেন, বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন সে সম্পর্কে জনগণের কোনো মতানৈক্য থাকতে পারে না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও শেখ মুজিবের মধ্যে আপসের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না।

২. ১৭ মার্চের মুজিব-ইয়াহিয়ার দ্বিতীয় বৈঠক : ১৭ মার্চ ইয়াহিয়া-মুজিব ২য় দফা বৈঠক হয়। তবে ১৮ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো বৈঠক হয় নি। ১৮ মার্চ করাচিতে জুলফিকার আলী ভুট্টো উচ্চ পর্যায়ের দলীয় নেতাদের সাথে আলোচনার পর সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শাসনতান্ত্রিক বিষয়ে আলোচনার জন্য ঢাকা সফরের যে আহ্বান জানিয়েছেন তা তিনি রক্ষা করতে পারছেন না। তিনি কতিপয় বিষয়ের ব্যাখ্যা চেয়েছেন কিন্তু কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি। এ অবস্থায় যদি তিনি ঢাকা যান তবে খুব বেশি লাভ হবে বলে তিনি মনে করেন না।

৩. ১৯ মার্চের মুজিব-ইয়াহিয়ার তৃতীয় বৈঠক : ১৯ মার্চ সকাল ১০ টায় মুজিব-ইয়াহিয়া তৃতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ভবনের এই রুদ্ধদ্বার বৈঠকেও কোনো সহকারী ছিলেন না। ২০ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া প্রথমবারের মতো তাদের উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে শেখ মুজিব সাংবাদিকদের বলেন আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পথে তারা এগুচ্ছেন। এদিন বিবিসির সংবাদ মাধ্যমে বলা হয় যে, পাকিস্তানের শাসনতান্ত্রিক সংকট দূরীভূত হচ্ছে। ২০ মার্চ আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, “গতকাল গভীর রাতে ঢাকা যাওয়ার জন্য তিনি আমন্ত্রণ পেয়েছেন এবং এ আমন্ত্রণের প্রেক্ষিতে ২১ মার্চ ঢাকা রওয়ানা হবার মনস্থ করেছেন।” ভুট্টো ঢাকায় এসে আলোচনায় মিলিত হলেও এ সম্পর্কে সংবাদপত্রে কিছুই প্রকাশিত হয় নি। এদিন বঙ্গন্ধুর সাথে ইয়াহিয়ারও বৈঠক হয় কিন্তু এ ব্যাপারে কিছু জানা যায় নি ।

৪. ২২ মার্চের মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চতুর্থ বৈঠক : ২২ মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবনে শেখ মুজিব-ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর মধ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক চলাকালে প্রেসিডেন্টের জনসংযোগ অফিসার বাইরের অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদের জানান যে, “প্রেসিডেন্ট ২৫ মার্চ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছেন। দেশের উভয় অংশের নেতাদের সাথে পরামর্শ করে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুবিধার জন্য প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।”

শেখ মুজিব অধিবেশন স্থগিত সম্পর্কে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “একথা আপনাদের জানা আছে যে, আমি বলেছিলাম আমাদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা অধিবেশনে যোগদান করব না। আমাদের দাবির প্রেক্ষিতে অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে।” শেখ মুজিব সাংবাদিকদের জানান তিনি পুনরায় ২৩ মার্চ প্রেসিডেন্টের সাথে দেখা করবেন এবং তাদের উভয় পক্ষের উপদেষ্টাদের বৈঠকও অনুষ্ঠিত হবে।

২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়ার মধ্যে কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় নি, এমনকি উপদেষ্টাদের মধ্যেও নয়। ২৩ মার্চ করাচিতে জাতীয় পরিষদে প্রতিনিধিত্বকারী পশ্চিম পাকিস্তানের ছোট ছোট দলগুলোর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবসে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পাকিস্তানের পতাকার বদলে স্বাধীন বাংলার জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়।

২৪ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতারা সমঝোতার শেষ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পিপিআই-এর ২৪ মার্চের এক খবরে জানা যায় ভুট্টোর উপদেষ্টারা প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টাদের সাথে বৈঠকে বসেছেন কিন্তু বৈঠকের খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় নি। আলোচনা অসমাপ্ত রেখে সামরিক বাহিনীকে নিরস্ত্র বাঙালির উপর আক্রমণ চালানোর নির্দেশ দিয়ে ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। আর এদিন নেমে আসে বাঙালিদের উপর নির্মম আঘাত ।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক রাজনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্য নিয়ে নয়; বরং লোক দেখানো উদ্দেশ্যেই এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ বৈঠক দফায় দফায় অনুষ্ঠিত হলেও কার্যত কোনো রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় নি। মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের সমাধান হলে ২৫ মার্চ রাতের এই নিষ্ঠুর গণহত্যা কখনই সংঘটিত হতো না ।