বহুদলীয় ব্যবস্থার দোষ-গুণ:

0
217

বহুদলীয় ব্যবস্থার দোষ-গুণ
Merits & Demerits of Multi party System

গুণ : বহুদলীয় ব্যবস্থার গুণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

১। দলীয় স্বেচ্ছাচার প্রতিরোধ : বহুদলীয় ব্যবস্থায় কোনো বিশেষ একটি দলের প্রভুত্ব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত।

না ফলে এই ব্যবস্থায় প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বরূপ প্রতিফলিত হয়।

বহুদলীয় ব্যবস্থায় কোনো দলের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচারের পথ রুদ্ধ হয়।

২। সুষ্ঠু জনমত গঠন : বহুদলীয় ব্যবস্থা সুষ্ঠু জনমত গঠনে সহায়তা করে।

কারণ এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি থাকায় জনগণের মতামতও বহুমুখী ও বৈচিত্র্যময় হয়ে থাকে।

ফলে সুষ্ঠু জনমত সহজেই পড়ে ওঠে। জনমতের উপর ভিত্তি করেই বহুদলীয় ব্যবস্থায় সরকার গঠিত হয়।

৩। প্রার্থী নির্বাচনে স্বাধীনতা : বহুদলীয় ব্যবস্থায় জনগণ নিজেদের পছন্দমতো যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে।

একদলীয় বা দ্বিদলীয় ব্যবস্থার মতো জনগণের ইচ্ছাকে সীমাবদ্ধ করার মতো পরিবেশ বহুদলীয় ব্যবস্থায় থাকে না।

তাই এ ব্যবস্থায় প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনে জনগণের সর্বাধিক স্বাধীনতা থাকে।

৪। রাজনৈতিক শিক্ষার প্রসার : বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রায় সব জনগণই নিজেদের মতাদর্শ অনুসারে কোনো না কোনো দলের সমর্থক হয়।

দল সম্পর্কে আগ্রহ ও অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হয়। ফলে জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

৫। কায়েমি স্বার্থের সৃষ্টি হয় না :
বহুদলীয় ব্যবস্থায় কায়েমি স্বার্থের সৃষ্টি হয় না এবং ক্ষমতাকে বিশেষ স্বার্থে ব্যবহার করে স্থিতিশীল শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনমতকে উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না।

কোনো দলের একক কর্তৃত্ব না থাকায় সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ বা কায়েমি স্বার্থের বিকাশ ঘটে না।

৬। রাষ্ট্রীয় সমস্যার সমাধানে সহায়ক : বহুদলীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন দল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরে।

এ সমস্যগুলো দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য দলগুলো সরকারের কাছে অনুরোধ জানায় ।

যার ফলে সরকার সমস্যাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সমাধানের ব্যবস্থা করে ।

৭। কোয়ালিশন সরকার গঠনের সুযোগ: বহুদলীয় ব্যবস্থায় কোনো একক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে না।

এ ক্ষেত্রে একাধিক দলের সমন্বয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের সুযোগ থাকে।

ফলে সংখ্যালঘু শ্রেণিও সরকার গঠনে অংশ নিয়ে স্বীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারে।

দোষ : নিচে বহুদলীয় ব্যবস্থার দোষগুলো আলোচনা করা হলো-

১। ক্ষণস্থায়ী সরকার : বহুদলীয় ব্যবস্থায় সরকার সাধারণত দুর্বল ও ক্ষণস্থায়ী হয়।

কারণ এতে কখনো কখনো একাধিক রাজনৈতিক দল নিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়।

দলগুলোর মধ্যে কোনোরূপ বিরোধ দেখা দিলে সকারের পতন ঘটে।

২। যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে অসুবিধা : বহুদলীয় ব্যবস্থায় জনগণ যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে গিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে থাকে।

এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের নিজ নিজ আদর্শ ও কর্মসূচি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচারণা চালায় এবং জনমতকে সপক্ষে টানার চেষ্টা করে।

এতে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তি বা প্রার্থীকে বাছাই ও নির্বাচিত করতে অসুবিধা হয়।

৩। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা : বহুদলীয় ব্যবস্থায় ঘন ঘন সরকারের উত্থান-পতন ঘটতে থাকে।

দলাদলি, রেষারেষি, বিশৃঙ্খলা ও হিংসাত্মক কার্যকলাপ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

৪। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব : বহুদলীয় ব্যবস্থায় সরকার ক্ষণস্থায়ী হওয়ায় সরকারের পক্ষে কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

ফলে দেশের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হয়।

৫। দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার : বহুদলীয় ব্যবস্থায় সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য দলীয় কর্মীদের বিশেষ সুযোগ- সুবিধা প্রদান করে এবং বিভিন্ন সরকারি গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি দেয়।

এতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির ব্যাপক প্রসার ঘটে।

৬। রাজনৈতিক দল ত্যাগ : বহুদলীয় ব্যবস্থায় ঘন ঘন দল পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে।

এতে সুবিধাবাদী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি নির্বাচিত হওয়ার পর ব্যক্তিগত স্বার্থসাধনের জন্য ঘন ঘন দল পরিবর্তন করে। ফলে রাজনৈতিক পরিবেশ কলুষিত হয়ে পড়ে।

৭। শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব : বহুদলীয় ব্যবস্থায় শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাব পরিলক্ষিত হয়।

এ ব্যবস্থায় বিভিন্ন দলের নীতি, আদর্শ ও কর্মসূচির ভিন্নতার কারণে বিরোধী দলগুলো ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে পারে না। ফলে সরকার অনেক সময় স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একদলীয়, দ্বিদলীয় ও বহুদলীয় রাজনৈতিক দলব্যবস্থা চালু রয়েছে।

তবে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, আধুনিক বিশ্বে রাজনৈতিক দলব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

রাজনৈতিক দল ও উপদল:
Political Party and Faction

১। রাজনৈতিক দল একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত হয়।
সুনির্দিষ্ট ও কল্যাণকামী মতাদর্শ নিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। অন্যদিকে উপদলের তেমন কোনো মহৎ উদ্দেশ্য থাকে না; বরং গুটিকয়েক লোকের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যই উপদলের সৃষ্টি হয় ।

২। রাজনৈতিক দলের অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশের জনগণের কল্যাণ সাধন করা। আর উপদল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কল্যাণে কাজ করে।

৩। রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত।

জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে রাজনৈতিক দল কর্মসূচি ঘোষণা করে।

অর্থাৎ সামগ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক দল কাজ করে।

অপরদিকে উপদলের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সংকীর্ণ। মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে উপদল কাজ করে।

মোটকথা জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে উপদল কোনো রকম কাজ করে না। অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থরক্ষায় উপদলের কোনো ভূমিকা নেই ।

৪। রাজনৈতিক দল বহু মানুষের সুশৃঙ্খল ও সুসংবদ্ধ এক রাজনৈতিক সংগঠন।

অপরদিকে উপদল স্বার্থান্বেষী
গোষ্ঠীর মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর দুর্বল সংগঠন।