পৌরনীতি ও সুশাসন পরিচিতি ( Introduction to Civics and Good Governance)

0
41

পৌরনীতি ও সুশাসন

সক্রেটিস (Socrates, ৪৬৯-৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব)।

দার্শনিক ও শিক্ষক হিসেবে খ্যাত ছিলেন।
তিনি দার্শনিক প্লেটোর শিক্ষাগুরু হিসেবে পরিচিত।

ব্যক্তিগত জীবনে পেশা হিসেবে তিনি প্রথমে বেছে নেন এথেন্সের সেনাবাহিনীর চাকরি।

পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে যোগ দেন। এরপর তিনি দর্শনচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।

সক্রেটিস মানবজীবনের জটিল প্রশ্নের সঠিক উত্তর খুঁজতে গিয়ে যে ‘পদ্ধতি’ বেছে নেন এর নাম ছিল ‘Socratic Method (সক্রেটিস পদ্ধতি) এবং ‘Dialectic Method’ (সংলাপ পদ্ধতি)।

সক্রেটিসের দর্শনচিন্তার প্রথম কথা ছিল ‘নিজেকে জানো’ (Know Thyself)। তাঁর মতে, ‘জ্ঞানই পুণ্য’ (Virtue is Knowledge)।

যাবতীয় পাপ বা অন্যায় সর্বত্রই অজ্ঞানতার ফল। তিনি বলেন, ভুল করা অনৈচ্ছিক এবং ধনসম্পদ ও ক্ষমতা কারও স্থায়ী অধিকার নয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ অব্দে এ মহান মনীষীকে বিচারের নামে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

অতঃপর দোষ স্বীকার অথবা হেমলক বিষপানে আত্মহত্যা করতে বলা হয়।

তিনি অন্যায়ের কাছে মাথানত না করে দ্বিতীয়টি বেছে নেন।
এভাবে এই মনীষীর জীবনাবসান ঘটে।

প্লেটো (Plato, ৪২৭-৩৪৭ খ্রিষ্টপূর্ব) :
বিখ্যাত দার্শনিক ছিলেন। তিনি দার্শনিক সক্রেটিসের যোগ্য শিষ্য।

তাঁর সমগ্র রাষ্ট্রচিন্তা, ধ্যানধারণা, মতবাদ ও তত্ত্ব ‘সংলাপ’ পদ্ধতিতে তুলে ধরেছেন, যা ‘Dialectic Method’ নামে পরিচিত।

তিনি ছিলেন কল্পনাবিলাসী। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাকেন্দ্রের নাম ছিল একাডেমি (Academy)।

এ একাডেমিতে শিক্ষা দেওয়া হতো দর্শন, গণিত, তর্কশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যা। তাঁর প্রধান তত্ত্বসমূহ ছিল- ন্যায়তত্ত্ব, সাম্যবাদ তত্ত্ব, দার্শনিক রাজা, শিক্ষাতত্ত্ব, সর্বাত্মকবাদ তত্ত্ব, আদর্শ রাষ্ট্র।

প্লেটো মনে করতেন, ন্যায়বিচার হলো যার যা পাওনা তা দিয়ে দেওয়া। যে ব্যক্তি যে কাজে যোগ্য তাকে সে কাজের দায়িত্ব দেওয়া।
তিনি বলতেন, শাসক ন্যায়বান হলে আইন দরকার নেই। কিন্তু শাসক দুর্নীতিপরায়ণ হলে সেখানে আইন মূল্যহীন।

তিনি মানবমনের ক্ষুধা, সাহস ও প্রজ্ঞা- এ তিন প্রবণতার কথাও বলেন।

| তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থসমূহ হলো- The Republic’, ‘The Statesman’, ‘The Laws’, ‘Apology’, ‘Crito’, ‘Laches’ প্রভৃতি।

মহান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্লেটো খ্রিষ্টপূর্ব ৩৪৭ অব্দে ৮০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

অ্যারিস্টটল (Aristotle, ৩৮৪-৩২২ খ্রিষ্টপূর্ব) : তিনি একাধারে দার্শনিক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, কবি ও চিন্তাবিদ ছিলেন।

তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন মহান দার্শনিক প্লেটো। তাঁর দর্শনের পদ্ধতি ছিল আরোহ পদ্ধতি ও তুলনামূলক পদ্ধতি (‘Inductive Method” and ‘Comparative Method’)।

তিনি ছিলেন বাস্তববাদী দার্শনিক। পেশাগত জীবনে অ্যারিস্টটল প্রথমে এশিয়া মাইনরের স্বৈরাচারী শাসক হার্মিয়াসের চিকিৎসক ও উপদেষ্টা পদে চাকরি নেন।

পরবর্তী সময়ে মেসিডনের যুবরাজ আলেকজান্ডারের গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর প্রধান তত্ত্বসমূহ ছিল- সরকারের শ্রেণিবিভাগ তত্ত্ব (Theory of Classification of Government’), নাগরিকতা তত্ত্ব (Theory of Citizenship), দাসতত্ত্ব (Theory of Slavery’), বিপ্লবতত্ত্ব (Theory of Revolution), আদর্শ রাষ্ট্রতত্ত্ব (Theory of Ideal State’)।

তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলো হলো- “The Politics’, The Categories’, ‘Propositions’, ‘The Two Analytics’, Topics’. The Treatises on Natural History’. “The Constitution of Athens’

৩৬৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এথেন্সে দর্শনচর্চার কেন্দ্র ‘লাইসিয়াম’ প্রতিষ্ঠা করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এটির পরিচালনার দায়িত্ব

পালন করেন। ৩২২ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ৬৩ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন।

পৌরনীতি ও সুশাসন:

সৃষ্টির সেরা মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে বাস করাই হলো মানুষের ধর্ম। মানুষ নামক বাস্তব সংগঠনের সৃষ্টি হয়েছে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের সভ্য হিসেবে মানুষের সমাজজীবন ও রাষ্ট্রীয় জীবনের পূর্ণত সামাজিকভাবে একত্রে বসবাস করতে গিয়ে কিছু নিয়মকানুনের আওতায় চলে আসে, যার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় আলোচনার প্রয়োজনে পৌরনীতির উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছে।

রাষ্ট্র ব্যতীত মানুষ কোনোভাবেই সুষ্ঠুভাবে জীবন যাপন বিজ্ঞান। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল ( Aristotle) বলেন, “Man is by nature a social and political being and করতে পারে না।

রাষ্ট্রের অপরিহার্য অঙ্গ হিসেবে নাগরিকের প্রসঙ্গ চলে আসে। এ জন্য পৌরনীতি নাগরিকতাবিষয়ক who does not live in a society is either a God or a beast. অর্থাৎ, “মানুষ স্বভাবতই সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রাচীনকালে মানুষ একত্রে বনে-জঙ্গলে বসবাস করত।

তারা পশুপাখি শিকার, ফলমূল সংগ্রহ এবং অন্যান খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে সবাই মিলে আহার করত। যদিও তাদের মধ্যে আদৌ সমাজ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা ছিল না ফলে বিভিন্ন নিয়মকানুন, শৃঙ্খলা, আচার-আচরণ, প্রয়োজন প্রভৃতি কারণে মানুষ গড়ে তোলে রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠান।

তবু তারা অবচেতনভাবেই সমাজে বসবাস করত। এভাবে সমাজজীবন শুরু হয়। পরবর্তীকালে সভ্যতার অগ্রগতির এ রাষ্ট্রীয় জীবনের অনুষঙ্গ হিসেবে নাগরিকদের সব কার্যক্রম বিশ্লেষণ করাই হলো পৌরনীতির কাজ।

আর এস কাজ সম্পাদনে কোনো সমস্যা তৈরি হচ্ছে কি না বা সঠিকভাবে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিষয়াদি পরিচালিত হচ্ছে কি না তার সুবন্দোবস্ত করাই হলো সুশাসন। সুশাসন ব্যতীত নাগরিক রাষ্ট্র থেকে তার হ্রাস অধিকার ভোগ করতে পারে না।

পাশাপাশি রাষ্ট্রের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ করে কর্তব্য পালন করতে পারে না। সুশাসন নাগরিককে কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, জবাবদিহিমূলক সরকার এবং ন্যায়ভিত্তিক উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে পৌরনীতি ও সুশাসন সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
পৌরনীতির মাধ্যমে নাগরিক রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রের ধারণা পায় এবং সুশাসনের মাধ্যমে তা বাস্তবে উপভোগ করে।

এ অধ্যায়ে আমরা পৌরনীতি ও সুশাসনের ধারণা, বৈশিষ্ট্য, পৌরনীতি ও সুশাসনের ক্রমবিকাশ এবং পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে অন্যান্য শাখার সম্পর্ক বিষয়ে জানতে পারব।

জীব এবং যে সমাজে বসবাস করে না, সে হয় পশু, না হয় দেবতা।”
[X] প্রধান শব্দসমূহ

নগররাষ্ট্র, > ল্যাটিন, > দার্শনিক, > সামাজিক বিজ্ঞান, > নাগরিকতা, > রাষ্ট্রীয় মতবাদ, > কল্যাণমূলক রাষ্ট্র, → নেতৃত্ব, > সাংবিধানিক, > স্বার্থগোষ্ঠী, > আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা, > জনকল্যাণ, > বিকেন্দ্রীকরণ, > বিশ্বব্যাংক, > মার্কসবাদ, > সরকারি অর্থব্যবস্থা।

শিখনফল : অধ্যায়ের পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা-
:
পৌরনীতির ধারণা বর্ণনা করতে পারবে।
ত্র সুশাসনের স্বরূপ বিশ্লেষণ করতে পারবে।

পৌরনীতি ও সুশাসনের ক্রমবিকাশ বর্ণনা করতে পারবে।

পৌরনীতি ও সুশাসনের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারবে।

পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে জ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে পারবে।

পাঠ পরিকল্পনা:

১ ১.১ : পৌরনীতি ও সুশাসনের ধারণা ও পরিধি

১ ১.২ : সুশাসনের ধারণা ও বৈশিষ্ট্য

১ ১.৩ : পৌরনীতি ও সুশাসনের ক্রমবিকাশ

১ ১.৪ : পৌরনীতি ও সুশাসনের সাথে জ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্রের সম্পর্ক :

রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, লোকপ্রশাসন, অর্থনীতি, নীতিশাস্ত্র, ভূগোল, জনসংখ্যা ও উন্নয়নচর্চা, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার
স্টাডিজ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি।