পৌরনীতির ধারণা ও সংজ্ঞা ( Concept and Definition of Civics):

0
318

[ পাঠ-১.১ : পৌরনীতির ধারণা ও সংজ্ঞা
Concept and Definition of Civics
পৌরনীতি নাগরিকতাবিষয়ক সামাজিক বিজ্ঞান।

পৌরনীতি সামাজিক বিজ্ঞানের একটি শাখা। প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রের ধারণা থেকে পৌরনীতির ধারণার সূত্রপাত ঘটে।

প্রাচীন গ্রিসে নগররাষ্ট্রে যারা বসবাস করত তারাই নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হতো।

পৌরনীতি ইংরেজি Civics শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ। আর Civics শব্দটি দুটি ল্যাটিন শব্দ Civis (সিভিস) ও Civitas (সিভিটাস) থেকে এসেছে।

শব্দ দুটির অর্থ হলো যথাক্রমে ‘নাগরিক’ ও ‘নগররাষ্ট্র’। সুতরাং নগররাষ্ট্রে বসবাসরত নাগরিকরা হলো পৌরনীতির মূলকেন্দ্র এবং তাদের আচার-আচরণ ও রাজনৈতিক কার্যাবলি বিশ্লেষণ হলো পৌরনীতির মূল আলোচ্য বিষয়।

প্রাচীন গ্রিসের নগররাষ্ট্রে নাগরিকরা প্রত্যক্ষভাবে শাসনকাজে অংশগ্রহণ করত।
কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রের ধারণায় পরিবর্তন এসেছে এবং আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গ্রিসের নগররাষ্ট্রে প্রত্যক্ষভাবে শাসনকাজে অংশগ্রহণকারীরাই কেবল নাগরিকের মর্যাদা পেত, কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রে বসবাসকারী সবাই নাগরিকের মর্যাদা পায় ।

গ্রিসের নগররাষ্ট্রগুলো ছিল আয়তনে ছোট, কিন্তু বর্তমানে জাতিরাষ্ট্র আয়তনে অনেক বিশাল এবং জনসংখ্যাও অনেক বেশি।
বর্তমানে নাগরিকের ভূমিকা রাষ্ট্রীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সম্প্রসারিত হয়েছে।

এজন্য নাগরিকদের ভূমিকা জটিল ও ভিন্নধর্মী মনে হয়। আধুনিক রাষ্ট্রের নাগরিকদের আচার-আচরণ, কার্যাবলি, বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সব বিষয় নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করে তা-ই পৌরনীতি।

সংকীর্ণ অর্থে পৌরনীতিকে অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত বিজ্ঞান বলা যায়। ব্যাপক অর্থে পৌরনীতি নাগরিকতা ও রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের সম্পর্কসংক্রান্ত বিজ্ঞান।

পৌরনীতির সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান
করেছেন।

প্রফেসর ই. এম. হোয়াইট (E. M. White) বলেন, “Civics is the subject that deals with everything appertaining to citizenship.”

অর্থাৎ, (“নাগরিকতার সাথে জড়িত সব প্রশ্ন নিয়ে যে শাস্ত্র আলোচনা করে তাকে
পৌরনীতি বলে)”

ই. এম. হোয়াইট তাঁর The Philosophy of Citizenship’ গ্রন্থে আরও বলেন, “Civics is that branch of human knowledge which deals with everything relating to a citizen- past, present and future; local, national and human.”

অর্থাৎ, “পৌরনীতি হলো জ্ঞানের সেই শাখা যা নাগরিকতার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এবং স্থানীয়, জাতীয় ও মানবতার সাথে জড়িত সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।”

এফ. আই. গ্লাউড (F. I. Gloud) বলেন, “Civics is the study of institutions, habits, activities and spirit by means of which a Man or Woman may fulfil the duties and receive benefits of membership in a political community.”

অর্থাৎ, “যেসব প্রতিষ্ঠান, অভ্যাস, কার্যাবলি ও চেতনার দ্বারা মানুষ রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সমাজের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন এবং অধিকার ভোগ করতে পারে, তার অধ্যয়নই হচ্ছে পৌরনীতি।”

ফ্রেডরিখ জেমস গুল্ড (Fredrick James Gould) বলেন, “Civics is the Study of Institutions, habits and spirits by means of which a man or women may fulfil the duties and receive the benefits of memberships in political community.”

অর্থাৎ, “পৌরনীতি হলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, অভ্যাস ও চেতনার অধ্যয়ন; যার মাধ্যমে একজন পুরুষ বা নারী তার কর্তব্য সম্পাদন করে এবং রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হিসেবে সুযোগ- সুবিধা ভোগ করতে পারে।”

Webster’s International Dictionary-তে বলা হয়েছে, “Civics is that department of political science dealing with rights of citizenship and duties of citizen.”

অর্থাৎ, “পৌরনীতি হলো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সেই শাখা, যা নাগরিকদের অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করে।”

পৌরনীতি ও সুশাসন কর্তব্যসমূহ:
Encyclopaedia Britanica-তে পৌরনীতির সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, “পৌরনীতিকে সামাজিক বিজ্ঞানের।

সেই শাখা বলে অভিহিত করা যায়, যেখানে সরকারের সংগঠন ও পদ্ধতি এবং নাগরিকের অধিকার ও আলোচনা করা হয়।

উপরে আলোচিত সংজ্ঞাগুলো ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় যে, নাগরিকের যাবতীয় কার্যাবলি বিশ্লেষণ করা হলো পৌরনীতির আলোচ্য বিষয়।

এ ক্ষেত্রে নাগরিক জীবনের সব রীতিনীতি, আচার-আচরণ, স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কার্যাবলি বিশ্লেষণ করা হয়।

আর সামাজিক জীব হিসেবে নাগরিকের উপর অর্পিত সব দায়িত্ব-কর্তব্য, অধিকার, মানবতা ও মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয় সমন্বয়ের মাধ্যমে আদর্শ সমাজ গঠনে প্রচেষ্টা চালানো হয়।

পৌরনীতি হলো নাগরিকতাবিষয়ক সামাজিক বিজ্ঞান। এককথায় পৌরনীতি হলো সেই শাস্ত্র, যা নাগরিকের সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি অধিকার ও কর্তব্য

এবং অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে নাগরিক জীবনের সমস্যা সমাধান ও পর্যালোচনা করে।
পৌরনীতির আলোচ্য বিষয় ছকাকারে নিচে দেওয়া হলো-

পৌরনীতি (Civics)

নগররাষ্ট্র (City State)

নাগরিক (Citizen)

অধিকার (Rights)

কর্তব্য (Duties)

রাষ্ট্র (State)

নাগরিকের অতীত বিষয়
(Past of Citizen )

নাগরিকের বর্তমান বিষয় (Present of Citizen )

নাগরিকের ভবিষ্যৎ বিষয় (Future of Citizen)

আন্তর্জাতিক মানবতা
(International Humanity)

নাগরিকের স্থানীয় ক্ষেত্র
নাগরিকের জাতীয় ক্ষেত্র

নাগরিকের আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র
(Local Position of Citizen)
(National Position of Citizen)
(International Position of Citizen)
সবশেষে বলা যায়,

পৌরনীতি হলো সামাজিক বিজ্ঞানের সেই শাখা, যা নাগরিক ও নাগরিকতার সাথে জড়িত সব
বিষয় নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করে ।