পাঠ-৬.৮ নেতৃত্বের ধারণা কি?:

0
53

পাঠ-৬.৮ নেতৃত্বের ধারণা
Concept of Leadership

নেতৃত্ব হচ্ছে সামাজিক অসাধারণ গুণ, যা স্বভাবত অপরকে আকৃষ্ট করে। আবার অনেকেই নেতৃত্বকে জন্মগত গুণ বলে উল্লেখ করেছেন।

সি. আই. বার্নার্ড বলেন, “বাস্তবিক আমি কখনো এমন নেতাকে দেখিনি যিনি সন্তোষজনকভাবে বলতে পেরেছেন যে, কেমন করে তিনি নেতা হওয়ার যোগ্য হয়েছেন।”

এ থেকে বোঝা যায়, নেতৃত্বের গুণ অর্জন করা যায় না; বরং তা বহুলাংশে জন্মগত। তবে নেতৃত্ব শুধু জন্মগত এরূপ ধারণাও ঠিক নয় ।

মানুষ তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করলেও সাধনার দ্বারা সেই যোগ্যতার বিকাশ ঘটায় এবং নেতৃত্ব উন্নত ও বলিষ্ঠ হয়।

নেতৃত্ব জনগণের সুখ-দুঃখ, আশা-ভরসাকে এমনভাবে ব্যক্ত করেন যেন তিনি জনগণের বন্ধু, পথপ্রদর্শক ও রক্ষাকর্তা।

জনগণ তার কথা ধৈর্য ধরে শোনে এবং তাকে সমর্থন করে।

অধ্যাপক এম. স্মিথ নেতৃত্বের কতগুলো বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।

যথা :
১। কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যসাধনের জন্য যার গুণাবলি অনন্য ও অসাধারণ তিনিই নেতা।

২। বিশেষ দায়িত্ব পালনে যার মর্যাদা সর্বাধিক তিনিই নেতা;

৩। যার বক্তব্য ও বাণী অপরকে সর্বাধিক অনুপ্রেরণা জোগায় তিনিই নেতা;

৪। যার কর্তৃত্বকে অন্যরা স্বীকার করে নেয় তিনিই নেতা;

৫। নেতা হলেন জনগণের অভিভাবক, পরিচালক, উৎসাহ প্রদানকারী ও পথপ্রদর্শক;

৬। যার অনুপ্রেরণায় জনগণ উদ্বুদ্ধ হয় তিনিই নেতা।

নেতৃত্বের উপর্যুক্ত ধারণাগুলো থেকে বলা যায়, নেতৃত্ব হলো একজন ব্যক্তির গুণ যা জনগণকে আকৃষ্ট, সংঘবন্ধ
একত্রিত করে।

°°নেতৃত্বের প্রকারভেদ
Types of Leadership°°

নেতৃত্বের বিভিন্ন প্রকারভেদ রয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেতাদের প্রকৃতি ও চরিত্র বিশ্লেষণ করছে।

নেতৃত্বের নিম্নলিখিত প্রকারভেদ সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যায়।

নিচে ছকের সাহায্যে নেতৃত্বের প্রকারভেদ তুলে ধরা হলো-

১। প্রশাসনিক নেতৃত্ব : প্রশাসনিক নেতৃত্বকে ব্যবস্থাপকের নেতৃত্বও বলা হয়।

ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত কোনো কর্মকর্তার বিশেষ দক্ষতাকে প্রশাসনিক নেতৃত্ব বলে।

প্রশাসনে জড়িত কোনো প্রশাসকের সাফল্য বা দক্ষতার উৎকর্ষের উপর প্রশাসনিক নেতৃত্ব নির্ভর করে।

প্রশাসনিক দক্ষতা ও স্থিতিশীলতা প্রশাসনিক নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল।
যেমন— আমলাতন্ত্র, কলকারখানা প্রভৃতি।

২। রাজনৈতিক নেতৃত্ব : রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করে।

কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মর্যাদার অধিকারী হয়ে উঠতে হলে তাকে রাজনৈতিক মতাদর্শভিত্তিক কোনো গোষ্ঠীকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণ করার গুণাবলি অর্জন করতে হবে।

৩। বিশেষজ্ঞসুলভ নেতৃত্ব : বিশেষজ্ঞসুলভ নেতৃত্ব হলো ব্যক্তির কোনো গুণ বা দক্ষতা, যা অপরকে আকৃষ্ট করে।

এই ধরনের নেতা অপরকে প্রভাবিত করেন না; বরং অন্যরাই তার ব্যক্তিগত দক্ষতার প্রতি আকৃষ্ট হয়।

যেমন: দার্শনিক, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, শল্য চিকিৎসক প্রভৃতি ।

৪। সম্মোহনী নেতৃত্ব : সম্মোহনী নেতৃত্বের ধারণা দেন জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার।

ইংরেজিতে একে Charismatic Leadership বলা হয়।

যখন কোনো বিশেষ নেতা তার বক্তব্য ও কাজ দ্বারা জনগণকে ভীষণভাবে আকৃষ্ট, অনুপ্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ করতে সক্ষম হয়, তখন সেই নেতৃত্বকেই সম্মোহনী নেতৃত্ব বলা হয়।

যেমন : বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে ব্যক্তি সম্মোহনী গুণাবলি অর্জন করেন জনগণ তাকে অন্ধভাবে শ্রদ্ধা করে।

সম্মোহনী অর্থাৎ বিশেষ ব্যক্তিত্ব ও গুণাবলি অর্জনকারী ব্যক্তি অবশ্যই অতি-প্রকৃত ক্ষমতার (Supernatural power) অধিকারী হন।

৫। একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্ব : একনায়কতান্ত্রিক নেতৃত্ব ব্যক্তির কর্তৃত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত।

কীভাবে সভা পরিচালিত হবে এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এ দুটি দিকই তিনি নির্দেশ করেন।

এ পদ্ধতিতে নেতা একক শাসক হিসেবে কাজ পরিচালনা করেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।

একনায়কের সহকর্মীরা সাধারণত তার অধীনে থাকেন। একনায়কতান্ত্রিক নেতা নিজ ধ্যানধারণায় অটল থাকেন এবং সর্বক্ষেত্রেই তার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত বলে মনে করেন ।

তিনি বিশ্বাস করেন, তার ধারণা সর্বক্ষেত্রেই সঠিক এবং তিনি ভুল করতে পারেন না।

উদাহরণণস্বরূপ জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনি ও স্পেনের ফ্রাংকোর কথা উল্লেখ করা যায় ।

৬। গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব : সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে যে নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, সে নেতৃত্বই গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব।

গণতান্ত্রিক নেতা জনগণের কল্যাণে উৎসাহী। তিনি সর্বদা গোষ্ঠীর সদস্যদের কল্যাণের জন্য সতর্ক থাকেন ।

গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব জনগণকে মুক্তি ও স্বাধীনতা দেয়। গণতান্ত্রিক নেতৃত্বে একজনের নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে অনেক মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকে।

এ ধরনের নেতার সিদ্ধান্তের বিপরীতে আলোচনা-সমালোচনার সুযোগ রয়েছে। এতে প্রত্যেক অংশগ্রহণকারী সংগঠনের একজন মূল্যবান সদস্য হিসেবে গণ্য হয় ।

গণতান্ত্রিক নেতাগণ তাদের গোষ্ঠীর সদস্যদের সমর্থন লাভের জন্য যেসব কৌশল অবলম্বন করে থাকেন, সেগুলো হলো- ক. তাদের কাছে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার মাধ্যমে।

খ. তাদের মধ্যে সহযোগিতা উন্নয়নের মাধ্যমে।

গ. সমস্যা সমাধানে সাহায্য করার মাধ্যমে।

ঘ. ব্যক্তিস্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে ।