পাঠ ৫.৭ জনমত গঠনের মাধ্যম সমূহ :

0
134

পাঠ ৫.৭ জনমত গঠনের মাধ্যম
Agencies of Forming Public Opinion

গণতান্ত্রিক সরকারের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য সত্যিকার বিচার বুদ্ধি ভিত্তিক সজাগ জনমতের একান্ত আবশ্যক। গণতন্ত্র হলো জনগণের শাসন।

সর্বসাধারণের মতামত প্রতিফলিত হয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। আর সর্বসাধারণের মতামতই হলো জনমত। সমাজ বা রাষ্ট্রে জনমত গঠনের পেছনে কিছু উপাদান বা মাধ্যম কাজ করে।

এগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-

১। পরিবার : মানুষ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, পরিবারেই তার বৃদ্ধি, প্রসার ও বিকাশ ঘটে।

তাই পরিবার হলো সামাজিকীকরণের প্রধান ধাপ। পরিবার থেকে মানুষ প্রথম শিক্ষা লাভ করে থাকে।

মানুষ তার পরিবারের মধ্যেই দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ ও সমস্যা নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে, যা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২। তথ্যপ্রযুক্তি : তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন জনমত গঠনের অন্যতম মাধ্যম বা বাহন। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ইত্যাদির আবিষ্কারের ফলে সবার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জনমত গড়ে তোলা সহজ হয়ে পড়েছে।

আর এটি সম্ভব হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চ গঠনের প্রসঙ্গটি। বলা যায়, এখানে জনমত সংগঠিত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে।

৩। সংবাদপত্র : সংবাদপত্র জনমত গঠনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। এটি শুধু সংবাদই সরবরাহ করে না, সাথে সাথে মত প্রকাশ করে, মন্তব্য প্রকাশ করে বিশিষ্টজনদের মতামত তুলে ধরে, যা রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় সমস্যা সমাধানে মানুষকে সচেতন করে তোলে।

গণশিক্ষা প্রসারের সাথে সাথে জনমত গঠনে সংবাদপত্রের প্রভাব ও ক্ষমতা অকল্পনীয়ভাবে বেড়েছে।

অধ্যাপক হারম্যান ফাইনার (Professor Herman Finer) লিখেছেন, “The press is the most widely disseminated single agent of instruction in the modern world.”, “আধুনিককালে সংবাদপত্র শিক্ষার এমন এক মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, যা সর্বাপেক্ষা ব্যাপকভাবে প্রচারিত।”

প্রকৃত জনমত জনসমক্ষে তুলে ধরতে হলে সংবাদপত্রকে অবশ্যই বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে হবে এবং নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে।

৪ । রাজনৈতিক দল : জনমত গঠনে রাজনৈতিক দল একটি অন্যতম মাধ্যম। রাজনৈতিক দলকে জনমত গঠনের শিক্ষাক্ষেত্র বলা যায়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের মাধ্যমে জনমত প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো আলোচনা করে এবং বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দলবদ্ধ হয়ে প্রচারকার্য পরিচালনা করে, যা জনমত গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অধ্যাপক আর. এম. ম্যাকাইভার (Professor R. M. MacIver), “Political parties are the agencies by which public opinion is translated into public policy.”

অর্থাৎ, “রাজনৈতিক দলের মাধ্যমেই জনমত সরকারি নীতিতে রূপান্তরিত হয়।”

৫। আইন পরিষদ : আইন পরিষদ জনমত গঠনের একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।

আইন পরিষদে জনপ্রতিনিধিগণ যে আলোচনা করেন, সব শ্রেণির স্বার্থ সম্পর্কিত যে সমাধান আনয়ন করেন, তা সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় এবং সেসব আলোচনা থেকে জনসাধারণ নিজেদের মত গঠনে সাহায্য পায়।

তাই আইন পরিষদ জনমতের প্রতিফলনও ঘটায়। মোটকথা আইন পরিষদে যে মতামত ব্যক্ত হয় তা প্রকৃতপক্ষে জনগণেরই মত।

বিশেষ করে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল আইন পরিষদে সরকারি নীতিমালা ও কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন দোষ-ত্রুটি তুলে ধরে।

মন্ত্রীগণ তাদের কাজের উপর বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। এসব তথ্য পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশনের সাহায্যে জনগণের সামনে আসে। আর এ থেকে জনমত গড়ে ওঠে।

৬। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান : শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনমত গঠনের অন্যতম বাহন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা সুষ্ঠু পরিবেশে বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে এবং বিভিন্ন সমস্যা সম্বন্ধে নিরপেক্ষভাবে ভাবতে শেখে।

ছাত্রছাত্রীরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে শিক্ষা লাভ করে তা পরবর্তীকালে তাদের প্রভাবিত করে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ছাত্রছাত্রীরা সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক ও নির্ভুল জ্ঞান অর্জন করে।

এখানেই তারা জীবনের নানাবিধ সমস্যা সম্পর্কে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে চিন্তা করার সুযোগ লাভ করে। তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭। সাহিত্য ও বইপত্র : বিভিন্ন ধরনের বইপত্র ও সাহিত্য জনমত গঠনের আর একটি বাহন।

লেখকের লেখনীতে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বাস্তব চিত্র পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। বিভিন্ন ধরনের সমস্যা জনসাধারণের সামনে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে, যা জনমত গঠনের জন্য বিশেষ সহায়ক।

৮। সভা-সমিতি : সভা-সমিতি জনমত গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

সভা-সমিতিতে বিভিন্ন বক্তা বিভিন্ন জাতীয় ইস্যু বা সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন, যা জনগণকে সচেতন করতে সহায়তা করে এবং এর মাধ্যমে জনমতও গড়ে ওঠে।

৯। টেলিভিশন, রেডিও, চলচ্চিত্র : টেলিভিশন ও রেডিও জনমত গঠনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

রেডিও ও টেলিভিশনে বিভিন্ন বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়, যা সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন করে তোলে এবং যা জনমত গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

এ মাধ্যম দুটি বাস্তবধর্মী ও সচেতনতামূলক পরিবেশনার মাধ্যমে জনমত গড়ে তোলে। চলচ্চিত্রও আধুনিককালে একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

জনমত গঠনে চলচ্চিত্র অন্য যেকোনো গণমাধ্যম থেকে বেশি কার্যকর। ‘ফারেনহাইট ৯/১১’ ছবিটি যুদ্ধবিরোধী জনমত গঠনে সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন তুলেছে।

তাই বলা যায়, সুস্থ, মানবিক ও গঠনমূলক চলচ্চিত্র জনমত গঠনে অবদান রাখতে সক্ষম।

১০। ধর্মীয় সংঘ : বিভিন্ন ধরনের ধর্মীয় সংঘ, যেমন : ইসলামিক ফাউন্ডেশন, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় বা ইস্যু নিয়ে জনগণের মধ্যে এক ধরনের সমর্থন তৈরি করে, যা জনমত বলে পরিগণিত হয়। ধর্মীয় মহাপুরুষদের জীবনাদর্শ জনমত গঠনে ভূমিকা পালন করে ।

১১। নির্বাচন : নির্বাচনে অধিকাংশ মানুষের মতামত প্রতিফলিত হয়, যা জনমতের অন্যতম শর্ত।

তাই বলা যায়, নির্বাচন জনমত গঠনের অন্যতম মাধ্যম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থাকে।

বিভিন্ন দলের মধ্য থেকে জনগণ একটি দলকে সমর্থন জানায়। অতএব, নির্বাচন হলো জনমত গঠনের অন্যতম মাধ্যম।

১২। গণভোট : বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে যখন রাষ্ট্রে দ্বিধাবিভক্তি সৃষ্টি হয় তখন গণভোট হয়।

সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে গণভোটের মাধ্যমে প্রকৃত জনমত প্রতিফলিত হয়। তাই জনমত গঠনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম বা বাহন হলো গণভোট ।

১৩। সরকার : সরকার জনমত গঠনের বাহন। সরকারি বিভিন্ন বক্তব্য এবং তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার পর জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।

১৪। বিরোধী দল : সরকারের বিরোধী দলও জনমত গঠনে প্রয়াস চালায়। সরকারি কোনো কাজ জনগণের জন্য অকল্যাণকর বা ক্ষতিকর হলে বিরোধী দল সেটা জনগণকে অবহিত করে।

এভাবে বিরোধী দলও জনমত গঠন
করতে পারে।

১৫। পেশা বা ব্যবসায়ভিত্তিক সংঘ : জনমত গঠনের একটি অন্যতম বাহন পেশা বা ব্যবসায়ভিত্তিক সংঘ।

বিভিন্ন পেশাভিত্তিক সংঘ, ইউনিয়ন বা সমিতি প্রায়ই বক্তব্য-বিবৃতি ও আলোচনায় জনমত গঠনে সাহায্য করে।

১৬। বন্ধুবান্ধব : শিশু যখন শৈশব, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখে তখন আস্তে আস্তে তার বন্ধুবান্ধবের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

তাদের সাথে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে এক ধরনের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে তাদের মনন গড়ে ওঠে।

১৭। কর্মক্ষেত্র : মানুষের কর্মস্থলের মাধ্যমে তার মতামত গড়ে ওঠে। কর্মস্থলে সহকর্মীদের সাথে মেলামেশা, ওঠাবসা ও আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সুস্পষ্ট মতামত গড়ে ওঠে।

১৮। অন্যান্য বাহন : জনমত গঠনের উল্লিখিত বাহন ছাড়াও আরও বহুবিধ মাধ্যম বা বাহন রয়েছে।

যেমন- প্রচারপত্র, দেয়াল লিখন, বিচারকের রায়, বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের অভিমত প্রভৃতি ।