পাঠ-২.৫ জীবন-জীবিকায় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব কি বা কাকে বলে আলোচিত করা হলো:

0
65

পাঠ-২.৫ জীবন-জীবিকায় ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব (Influence of Geographical Features)

আরব উপদ্বীপে সর্বপ্রথম কারা বসতি স্থাপন করেছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।

তবে অধিকাংশের মতে আরবজাতি সেমিটিকদের বংশধর।

কালের প্রবাহে সেমিটিক জাতির লোকেরা বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তরিত হয়ে ইতিহাস বিখ্যাত ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয়, ফিনিশীয় এবং হিব্রু বা ইহুদি জাতি নামে পরিচিত হয়।

আরবের অধিবাসীদের পরিচয় : সেমেটিক গোষ্ঠীর সম্ভাব্য ধাত্রী এই আরব ভূখণ্ড।

এখান থেকে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা করে পথিকেরা উত্তরকালে ইতিহাসে ব্যাবিলনীয়, অ্যাসিরীয়, ফিনিশীয় বা হিব্রু নামে পরিচিত হয়।

বিশুদ্ধ সেমেটিক চরিত্রের উৎস অনুসন্ধান করতে হবে এ আরবের বালুরাশির মধ্যেই। এখানে রোপিত ও অঙ্কুরিত হয়েছিল ইহুদি ধর্ম এবং খ্রিষ্টধর্মের বীজ।

মধ্যযুগে এই আরবেই জন্ম হয় এক মহামানবের যিনি সেই সময়ের সভ্য বিশ্বের অধিকাংশই জয় করেছিলেন, প্রবর্তন করেছিলেন শান্তির ধর্ম ইসলাম।

এভাবে আরব উপদ্বীপে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন গবেষক ও জাতিগোষ্ঠী বসতি স্থাপন করেছিল।

বিভিন্ন গবেষক ও ঐতিহাসিক প্রাচীন আরবদের ৩টি জাতিতে বিভক্ত করেছেন। যেমন-

১ . আরব-ই-বায়দা : আরবের আদিম অধিবাসীদের ‘আরব-ই-বায়দা বলা হয়। ‘বায়দা’ শব্দের অর্থ জঙ্গল।

বায়দাদের বেদুইন বলা হয়। পবিত্র কুরআনে বর্ণিত প্রখ্যাত বংশ আদ ও সামুদ এবং তাসম, জাদিস, জারহাম ও আসালিকা বংশ এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

পরবর্তী জাতিগুলোর আবির্ভাবের এসব জাতি ধ্বংস বা বিলুপ্ত হয়ে যায় ।

২ . আরব-ই-আরিবাহ :
আরব-ই-আরিবাহ জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হলো দক্ষিণ আরবের বনু কাহতান বংশ।

এরা দক্ষিণ আরব বা ইয়েমেনে বাস করত বলে এদের ইয়েমেনি বা হিমারীয় নামে অভিহিত করা হয়।

আর ইতিহাসে এ জাতিই আরব-ই-আরিবাহ বা প্রকৃত আরব নামে পরিচিত।

এ কাহতান জাতির উত্থানের মধ্য দিয়ে আরবের সত্যিকারের ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়।

স্যার সৈয়দ আমীর আলীর মতে, ইয়েমেন ও হাজরামাউতে বসবাসকারী সেমেটিকগণ (হযরত নূহ (আ.)-এর পুত্র সামের বংশধরগণ সেমেটিক নামে পরিচিত) কাহতানের বংশধর।

কাহতানের জারহাম ও ইয়াবির নামক দুই পুত্র ছিল। জারহাম ছিলেন হেজাজের শাসক আর ইয়াবির ছিলেন ইয়েমেনের শাসক ।

ইয়াবিরের পৌত্র আবদুস শামসের (ডাকনাম সাবা) নামানুসারে এ বংশের রাজাদের সাবীয় বলা হতো ।

৩. আরব-ই-মুস্তারিবাহ :
আরব-ই-মুস্তারিবাহ বলা হয় উত্তর আরবের অধিবাসীদের।

এ জাতির প্রতিষ্ঠাতা হলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধর আদনান।

আদনানের দুজন বংশধর ছিলেন- নিযার ও যাদার। এজন্য ইসমাইলীয় সম্প্রদায় তাদের পূর্বপুরুষদের নামানুসারে আদনানীয় বা নিযারীয় বা মুদারীয় নামে পরিচিত।

আমাদের প্রিয়নবি হযরত মুহাম্মদ (স.) ছিলেন আরব-ই-মুস্তারিবাহর অন্তর্ভুক্ত।

ভৌগোলিক অবস্থানগত দিক থেকে আরবের অধিবাসীদের শ্রেণিবিভাগ :

আরবে দুই ধরনের নাগরিক ছিল। মরুবাসী ও শহরবাসী। উভয় শ্রেণির চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আলাদা ছিল।

তবে সার্বিক দিক থেকে তাদের মধ্যে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল না।

সমগ্র প্রাচীন আরবের প্রায় ২০% জনগোষ্ঠী ছিল শহরবাসী এবং বাকি প্রায় ৮০% ছিল মরুবাসী।

৮০% মরুবাসী ছিল যাযাবর।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে আরবের অধিবাসীরা প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত :

(ক) নগরবাসী বা স্থায়ী বাসিন্দা ও (খ) মরুবাসী বেদুইন বা যাযাবর।

ক. নগরবাসী মরুময় আরবের যেসব অধিবাসী শহরে বা লোকালয়ে বসবাস করে তারাই নগরবাসী বা স্থায়ী বাসিন্দ তারা ব্যবসায় বাণিজ্য করে জীবনযাপন করত এবং এর মাধ্যমে তারা বহির্বিশ্বের সাথে যোগযোগ স্থাপন করা তারা ছিল মরুবাসী বেদুইনদের তুলনায় অধিকতর রুচিসম্পন্ন, মার্জিত ও সংস্কৃতিমনা।

ওমান, ইয়েমেন হাজরামাউতের উর্বর অঞ্চলে প্রথম দিকে নগর গড়ে উঠলেও কালক্রমে পানির উৎসকে কেন্দ্র করে মক্কা, মদিন তায়েফ, ইয়াসরিবসহ বিভিন্ন স্থানে নগর গড়ে ওঠে এবং নগরবাসী স্থায়ী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

এ কে. হিট্টির মতে, বেদুইনদের একটা অংশ ধীরে ধীরে শহুরে মানুষে পরিণত হচ্ছিল।

খ. মরুবাসী বেদুইন বা যাযাবর : আরবের বেশিরভাগ অধিবাসীকেই বেদুইন বলে অভিহি হতো।

সাধারণত যাদের স্বপ বাসস্থান নেই তারাই বেদুইন বা যাযাবর। সৈয়দ আমীর আলীর মতে, ‘মরুবাসী আরবদের বেদুইন বলা হয়।’

অর্থ যে সমস্ত আরব মরুপ্রান্তরকে ভালোবেসে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে তারাই বেদুইন।

আরব অধিবাসীদের শতক ৮০% মরুভূমির বাসিন্দা। এজন্য তাদের ‘আহল-উল-বাদিয়া’ বা মরুবাসীও বলা হয়। বেদুইনরা কোথাও স্থায়িভাবে বসবাস করতে পারত না।

গৃহপালিত পশুর ঘাস ও পানির সন্ধানে তারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে বেড়ায়। চলার পথে কোনো তৃণভূমি অথবা পানির সন্ধান পেলে তারা তাঁবু ফেলে কিছুদিন অবস্থান করত।

তারা সর্বদা কলরে লিপ্ত থাকত । এ কলহের মূল কারণ উভয় দলের আত্মরক্ষা ও স্বার্থ সংরক্ষণের প্রাণান্ত চেষ্টা।

আরবের অধিবাসীদের ওপর ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব :

আরব অধিবাসীদের ওপর ভৌগোলিক পরিবেশের প্রভাব সম্পর্কে নিচে আলোকপাত করা হলো :

১. উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন : মরুবাসী বেদুইনরা ছিল বরাবরই উদ্দাম ও বেপরোয়া।

তারা সবসময় উদ্দাম ও উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করত। মরুভূমির উগ্র কঠোর প্রকৃতি, পানির স্বল্পতা, অসহ্য উত্তাপ, অনুর্বরতা ও খাদ্যের অভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তারা হয়েছে উদ্দাম ও অপ্রতিরোধ্য।

জীবনধারণের জন্য তারা পশুপালনের সাথে সাথে বিভিন্ন বাণিজ্য কাফেলা ও আশপাশের বসতিতে লুটতরাজ চালাত। হিট্টির মতে, লুটতরাজ ছিল বেদুইনদের অন্যতম পেশা।

আল-খাল্লা, কোমরবন্ধ, ফিতা দিয়ে বাঁধা শিরস্ত্রাণ তাদের প্রধান পোশাক কিন্তু তারা জুতা ব্যবহারে অভ্যন্ত নয়।”

২।গোত্রীয় জীবন : ভৌগোলিক কারণে আরববাসী গোত্রীয় জীবনযাপন করত।

পি. কে. হিট্টির মতে, “বেদুইন সমাজের ভিত্তি হলো গোষ্ঠীবদ্ধতা।”

বেদুইনরা পরিবারবদ্ধ তাঁবুতে বসবাস করে।
এ রকম কয়েকটি তাঁবু নিয়ে গঠিত হয় একটি শিবির বা ‘হাই” (hayy) এবং একাধিক ‘হাই’-এর সদস্যরা মিলে গঠন করে গোষ্ঠী বা ‘কওম’ (Qawmi স্বজাতীয় কয়েকটি গোষ্ঠী একত্রিত হলে গড়ে ওঠে একেকটি উপজাতি বা ‘কাবিলা’ (Qabilah) ।

কাবিলা বা গোত্রের প্রধানকে ‘শেখ’ বলা হতো। বয়োজ্যেষ্ঠতা, বিজ্ঞতা, সাহস, বীরত্ব প্রভৃতি গুণের ভিত্তিতে শেখ নির্বাচিত হতো।

কখনো কোনো গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হলে তা বংশপরম্পরায় চলতে থাকত এবং রক্তের বদলে রক্তই ছিল।
মরভূমির আইন ।

৩. আসাবিয়া বা গোত্রীয় চেতনা:
আরববাসীর বসবাসের মূলমন্ত্র ছিল আসাবিয়া বা গোত্রপ্রীতি।

গোত্রীয় চেতনা, গোত্রের জন্য মমত্ববোধ ও জানমাল উৎসর্গ করার মনোভাবকে আসাবিয়া বা ‘গোত্রীয় চেতনা’ বলা হয়।

মূলমন্ত্র হলো গোষ্ঠীর অন্য সদস্যদের প্রতি সীমাহীন ও নিঃশর্ত আনুগত্য।

বেদুইনদের গোত্রীয় চেতনা এতই প্রবল ছিল যে তারা নিজ গোত্রবহির্ভূত সবকিছুকে বিজাতীয়, ঘৃণার পাত্র ও শত্রুভাবাপন্ন বলে মনে করা করত।

৪. ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ ও আতিথেয়তা:
মরুবাসী বেদুইনগণ আঞ্চলিকতা ও জাতীয়তাবোধে বিশ্বাসী না হয়ে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধে বিশ্বাসী ছিল।

পি. কে. হিট্টির মতে, “ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য্যবাদ তাদের মনের এত গভীরে প্রবেশ করেছিল


যে, বেদুইনরা কখনোই নিজেদের আন্তর্জাতিক মানের সামাজিক জীবনের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেনি।”

রক্তের বদলে রক্তের নীতিতে বিশ্বাসী হলেও তারা ছিল খুবই অতিথিপরায়ণ।

যত বড় শত্রুই হোক না কেন, কোনো বেদুইনের ঘরে কেউ আশ্রয় নিয়ে আশ্রয়দাতা তাকে খুবই সমাদর করতেন।

৫. সংগ্রামী জীবন : ভৌগোলিক অবস্থার প্রভাবে আরবাবাসী স্বভাবতই সংগ্রামী।

আরব দেশের শুষ্ক আবহাওয়া, অনাবৃষ্টি, ভূমির অনুর্বরতা, পানীয় জলের অভাব, চারণভূমির স্বল্পতার জন্য আরবরা জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করত।

প্রকৃতির সাথে লড়াই করতে করতে তারা একদিকে যেমন – রুক্ষ, দুঃসাহসী, দুর্ধর্ষ সৈনিক; অন্যদিকে তারা কষ্টসহিষ্ণু, কঠোর পরিশ্রমী ও ধৈর্যশীল হয়ে গড়ে ওঠে।

প্রাকৃতিক এসব বৈশিষ্ট্যের জন্য মরুকে ভালোবেসে গড়ে ওঠে বেদুইন বা যাযাবর গোষ্ঠী।

মরুভূমিতে অবস্থান করার জন্য শিকার, পশুপালন ও লুটপাটকে বেদুইনরা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নেয়।

অন্যদিকে, শহরবাসী আরবরা কৃষি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের জীবনমানকে উন্নত করে ।

৬. স্বাধীনচেতা : আরবরা সর্বসময় স্বাধীনচেতা ছিল।

তারা স্বাধীনতাহীনতাকে জীবনের মৃত্যু মনে করত।
আরব দেশের তিন দিকে সাগর অন্যদিকে পাহাড়, উপত্যকা ও মরুভূমি থাকায় প্রতিকূল পরিবেশের কারণেই এ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি প্রভাবমুক্ত ছিল।

দিগন্তবিস্তৃত মরুভূমির বাঁধাবন্ধনহীন মুক্ত পরিবেশে বসবাসের ফলে আরব বেদুইনরা স্বাধীন ও স্বতন্ত্র জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং এর ফলেই আরবীয়রা বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি অর্জন করেছিল।

৭. কাব্যপ্রিয়তা : আরব উপদ্বীপের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ও নৈসর্গিক দৃশ্য মরুবাসী বেদুইন ও শহরবাসী আরবদের গভীর আত্মসচেতন ও কাব্যিক ভাবধারায় অনুপ্রাণিত করে।

ইসলামের আবির্ভাবের যুগেও আরবে মক্কার নিকটবর্তী স্থানে প্রতিবছর উকাজ মেলা বসত।

মেলায় কবিতা প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। পুরস্কারপ্রাপ্ত কবিতাকে কাবার দেয়ালে স্বর্ণকাপড়ে লিখে ঝুলিয়ে রাখা হতো।

ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর. এ. নিকলসনের মতে, “ঐ সময় আরবে কবিতা গুটিকয়েক রুচিশীল লোকের বিলাসিতা ছিল না, বরং তা ছিল আরবদের সাহিত্য অনুভূতি প্রকাশের একমাত্র মাধ্যম।”

মূলত ভৌগোলিক পরিবেশ আরবদের মনে সুন্দরতম প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছিল।

৮. প্রকৃতি পূজা : আরবের ভৌগোলিক উপাদানের প্রভাব আরববাসীদের ধর্মীয় জীবনেও ব্যাপকভাবে লক্ষণীয়।

আরববাসীর এক বিশাল অংশ সূর্য, বড় গাছ, পর্বত, আগুনকে পূজা করত।

তারা পবিত্র কাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করে । যার মধ্যে উজ্জাহ, হোবল, লাত, মানাত অন্যতম ছিল।

তাদের মনে ধর্মীয় প্রভাব তেমন গভীর ছিল না বলে প্রতিনিয়ত তারা ধর্মচর্চা থেকে দূরে থাকত ।