ক্রায়োসার্জারি কি বা ক্রায়োসার্জারি বলতে কি বুঝো

0
355

ক্রোয়োসার্জারি (Cryosurgery)
কুফল নিয়ে আলোচনা করবে।

তরল নাইট্রোজেন
-196
ব্যবহৃত গ্যাস
তাপমাত্রা
তরল নাইট্রোজেন ডাই মিথাইল ইথার প্রোপেন
-196
-41°C
-89°C
-182.9°C
79°C
নাইট্রান অক্সাইড তরল অক্সিজেন সলিড কার্বন-ডাই-অক্সাইড।

ক্রায়োসার্জারি হলো এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যার মাধ্যমে অত্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রায় শরীরের অস্বাভাবিক বা রোগাক্রান্ত কোষগুলোকে ধ্বংস করা যায়।

গ্রিক শব্দ ‘ক্রায়ো’ (বরফের মতো ঠাণ্ডা) এবং ‘সার্জারি’ (হাতের কাজ) শব্দ দু’টি হতে ক্রায়োসার্জারি শব্দটি এসেছে।

ঐতিহাসিকভাবেই বেশ কিছু রোগের চিকিৎসার জন্য ক্রায়োসার্জারিকে ব্যবহার করা হতো, যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিপজ্জনক চর্ম সংক্রান্ত সমস্যাও রয়েছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ২৫০০ সালের দিকে মিশরিয়রা ত্বকের বিভিন্ন ধরনের ক্ষত ও প্রদাহের ২৩ চিকিৎসায় শীতল তাপমাত্রা ব্যবহার করতো। জেমস আরনট কর্তৃক মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় লবণ পানিকে বরফে জমাকৃত করে ব্যবহার করার পদ্ধতি বর্ণিত হওয়ার মাধ্যমে ১৮৪৫ সালে ইংল্যান্ডে প্রথম ক্রায়োসার্জারির ব্যবহার শুরু হয়।

তবে ত্বকের চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারির ব্যাপক প্রয়োগ শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিক থেকে।

১৯০৭ সালে হোয়াইট হাউসের এক রিপোর্টে প্রায় ১৫ জন ত্বকের ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিরাময়ে ক্রায়োসার্জারির সাফল্য উল্লেখ করা হয়।

এ সময় শিকাগোর চিকিৎসা বিজ্ঞানী ক্রায়োসার্জারিতে প্রথম কার্বন ডাই অক্সাইডের ব্যবহার প্রবর্তন করেন এবং তার পর ক্রায়োসার্জারির কাজে কার্বন ডাই অক্সাইডের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হতে থাকে ।

ক্রায়োসার্জারির পথিকৃৎগণ
ডঃ রে অ্যালিংটন (Dr. Ray Elington) ক্রায়োসার্জারিতে প্রথম তরুণ নাইট্রোজেনের ব্যবহার শুরু করেন তিনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই তরুণ নাইট্রোজেনে তুলোর পুঁটলি ডুবিয়ে তা দিয়ে বিভিন্ন ত্বকের ক্ষতের চিকিৎসা শুরু করেন।

তার এই তরল নাইট্রোজেনের প্রয়োগ পরবর্তীতে ক্রায়োসার্জারির জন্য তরল নাইট্রোজেনের ব্যবহারকে জনপ্রিয় করে তোলে। বর্তমানে সব ধরনের ক্রায়োসার্জারীতেই তরল নাইট্রোজেনের ব্যবহার হয়ে থাকে।

ডাঃ ইরভিং কুপার
(Dr. Irving Cupper) (1922-1985) পূর্ণ নাম ডাঃ ইরভিং এস কুপার। ক্রায়োসার্জারির ক্ষেত্রে তার অবদান গুরুত্বের সাথে স্বীকার করা হয়। কেননা
১৯২০ সালের দিকে ক্রায়োসার্জারিতে তরল অক্সিজেনের ব্যবহার শুরু হয়।

১৯৫০ সালে ড. রে এলিংটন ক্রায়োসার্জারিতে তরল নাইট্রোজেন প্রয়োগ করেন। আধুনিক ক্রায়োসার্জারির পথ চলা শুরু হয় ডঃ ইরভিং কুপার আর্নল্ড লি এর হাত ধরে।

পরবর্তীতে অন্যান্য ক্রায়োজনিক এজেন্ট যেমন— নাইট্রাস অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, আর্গন, ইথাইল ক্লোরাইড এবং ফ্লোরিনেটেড হাইড্রোকার্বন ব্যবহার করে ক্রায়োসার্জিক্যাল চিকিৎসায় আরো উন্নতি সাধন করা হয়।

যে তাপমাত্রায় বরফ জমাট বাঁধে, দেহকোষে তার চেয়েও নিম্ন তাপমাত্রার ধ্বংসাত্মক শক্তির সুবিধাকে গ্রহণ করে ক্রায়োসার্জারি কাজ করে। এতে নিম্ন। তিনিই প্রথম তুলার পুঁটলির পরিবর্তে লিকুইড তাপমাত্রায় দেহকোষের অভ্যন্তরস্থ বরফ ক্রিস্টালগুলোর বিশেষ আকার বা বিন্যাসকে ছিন্ন করে দূরে সরিয়ে দেয়া যায়।

ক্রায়োসার্জারির ক্ষেত্রে সাধারণত পৃথক পৃথকভাবে তরল নাইট্রোজেন, কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুষার, আর্গন এবং সমন্বিতভাবে ডাইমিথাইল ইথার ও প্রোপেন এর মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়।

এদের কোনো কোনোটি–41°C তাপমাত্রার উদ্ভব ঘটায়। পাশের ছকে ক্রায়োসার্জারিতে ব্যবহৃত গ্যাস ও তাদের তাপমাত্রা প্রদর্শিত হলো।
যথা-
নাইট্রোজেনের প্রোব ব্যবহার করেন যা -196 তাপমাত্রা ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত কোষকে ধ্বংস করতে ব্যর্থ হয়। এই বিশেষ ইকুইপমেন্টটি ক্রায়োসার্জারির ক্ষেত্রে অনেক নতুন সম্ভাবনার দরজা বর্তমানে ক্রায়োসার্জারিতে যে খুলে দেয়।

ক্রায়োপ্রোব ব্যবহার হয় তা তার ব্যবহৃত ইকুইপমেন্টেরই বিবর্তিত রূপ।

চিত্র : তরল নাইট্রোজেন স্প্রে করার জন্য ব্যবহৃত ক্রায়োগান
ক্রায়োসার্জারির ব্যবহার (Application of Cryosurgery)

১. ওয়ার্ট, মোল, স্ক্রিন ট্যাগ, সোলার কেরাটোস, মর্টনস নিউরোমা এবং ছোটোখাটো চর্ম ক্যান্সারসমূহের জন্য ক্রায়োসার্জিক্যাল
দেয়া হয়।

২. বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ শারীরিক ব্যাধি যেমন- লিভার ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, লাং ক্যান্সার, ওরাল ক্যান্সার, সার্ভিক ব্যাধিসমূহের চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

৩, মানবদেহের কোষকলার কোমল অবস্থা যেমন- প্ল্যান্টার ফ্যাসিলিটিস এবং ফিবরোমাকে ক্রায়োসার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারি প্রয়োগ (Application of Cryosurgery in Treatment)
চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারি প্রয়োগের বহুবিধ সুবিধা রয়েছে। “ক্রায়োসার্জারির মাধ্যমে রক্তপাতহীন অপারেশন সম্ভব”- নিম্নোক্ত সুবিধাসমূহ বিশ্লেষণ করলেই এর সত্যতা নিরূপণ করা যাবে।

১. ক্রায়োপ্রোবের সুঁচের প্রান্ত দিয়ে আক্রান্ত টিস্যু বা টিউমারের কোষকে বরফ শীতল তাপমাত্রায় জামাটবদ্ধ করার জন্য তর নাইট্রোজেন, আর্গন বা অন্যান্য ক্রায়োজনিক এজেন্ট পৃথক পৃথকভাবে ঐ স্থলে প্রবেশ করানো হয়।

এগুলোর কোনো কোণটি -৪১° ডিগ্রি তাপমাত্রার উদ্ভব ঘটায়; যার ফলে আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুর পানি জমাটবদ্ধ হয়ে সেটিকে একটি বরফ খা 2 পরিণত করে।

এ সময় আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাবার কারণে উক্ত কোষ বা টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অতঃপর পুনরায় ঐ স্থানে ক্রায়োপ্রোবের সাহায্যে হিলিয়াম গ্যাস প্রবেশ করিয়ে এই তাপমাত্রাকে ২০° থেে ৩০° পর্যন্ত ওঠানো হয়। এতে আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুটির বরফ গলে গিয়ে এটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

আক্রান্ত স্থানে সুনির্দিষ্ট কে বা টিস্যুকে নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার জন্য আলট্রা সাউন্ড বা এমআরআই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। ফলে এর আশেপাশে খান সুস্থ কোষগুলোর কোনো ক্ষতি হয় না।

প্রয়োজনে এই প্রক্রিয়াটি দুই তিনবার চালানোর প্রয়োজন হয়। কেননা ক্রায়োসার্জা ভালোভাবে সম্পন্ন হওয়ার জন্য আক্রান্ত কোষ বা টিস্যুগুলো কমপক্ষে ৫ থেকে ১০ মি.মি পুরো বরফের আস্তরণে আবৃ করার প্রয়োজন পড়ে।
অনেক সময় প্রয়োজনে একাধিক ক্রায়োপ্রোবও ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

২. ক্রায়োসার্জারি চিকিৎসা পদ্ধতিতে প্রচলিত শল্য চিকিৎসার মতো অতটা কাটাছেঁড়া করার প্রয়োজন হয় না।

৩. এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই বললেই চলে।

৪. এ পদ্ধতিটি ধীরে ধীরে কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং অস্ত্রোপচার চিকিৎসার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। ফলে ক্যান্সার নিউরো রোগীদের কাছে দিন দিন এর গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

৫. সকল ধরনের ক্যান্সার চিকিৎসায় এ পদ্ধতি চিকিৎসকদের বাড়তি সুবিধা এনে দিয়েছে। নিউরোসার্জারি এবং টিউমার ক্যান্সার রোগের চিকিৎসায় ক্রায়োথেরাপি পদ্ধতি বিশেষভাবে কার্যকর।

৬. ওয়ার্ট, মোল, স্ক্রিন ট্যাগ, সোলার কেরাটোস, মর্টনস নিউরোমা এবং ছোটোখাটো চর্ম ক্যান্সারসমূহের জন্য ক্রায়োসার্জিক্যা . চিকিৎসা দেয়া হয়।

৭. বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ শারীরিক ব্যাধি যেমন- লিভার ক্যান্সার, প্রোস্টেট ক্যান্সার, লাং ক্যান্সার, ওরাল ক্যান্সার, সার্ভিক্যাল ব্যাধিসমূহের চিকিৎসায় ক্রায়োসার্জারি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।