অধিকারের শ্রেণিবিভাগ। অধিকার কত প্রকার?

0
325

অধিকারের শ্রেণিবিভাগ Classification of Rights:

অধিকারকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়।
যথা- ক. নৈতিক অধিকার ও (খ) আইনগত অধিকার ।

ক. নৈতিক অধিকার : নৈতিক অধিকার মানুষের নৈতিক অনুভূতির উপর নির্ভর করে এবং এগুলো কোনো বৈ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রক্ষিত হয় না।

এ জন্য সাধারণত শাস্তির নির্দিষ্ট বিধান নেই। যেমন- বৃদ্ধ বয়সে সন্তানের কাছ থেকে পিতামাতার সহযোগিতা লাভের অধিকার।

নৈতিক অধিকার বিভিন্ন সমাজে বিভিন্ন রকম হতে পারে।

খ. আইনগত অধিকার : রাষ্ট্রীয় আইন দ্বারা স্বীকৃত অধিকারকে আইনগত অধিকার বলে।

আইনগত অধিকারের মূলভিত্তি হলো রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত আইন। রাষ্ট্রে বসবাসকারী কোনো নাগরিক আইনগত অধিকার করতে পারে না।

এটি অমান্য করলে রাষ্ট্র তাকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি প্রদান করতে পারে। যেমন- স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার, চলাফেরার অধিকার, সম্পত্তি ভোগের অধিকার ইত্যাদি।

আইনগত অধিকারকে আবার তিন ভাগে ভাগ করা যায়- সামাজিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার ও অর্থনৈতিক অধিকার।

অধিকার :
নৈতিক অধিকার< আইনগত অধিকার >সামাজিক

আইনগত
রাজনৈতিক
অর্থনৈতিক

সামাজিক অধিকার:

সামাজিক অধিকার বলতে সেসব অধিকারকে বোঝায় যা ছাড়া সমাজের সদস্য হিসেবে সুন্দর ও সভ্য জীবন যাপন করা সম্ভব নয়।

এসব অধিকারের সহায়তায় নাগরিকগণ তাদের ব্যক্তিত্ব উপলব্ধি করে সামাজিক জীবনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে।
স্থান, কালভেদে এই অধিকারগুলোর মধ্যে পার্থক্য দেখা গেলেও এর মধ্যে কতকগুলে রয়েছে মৌলিক ।

নিচে সামাজিক অধিকারের আওতাধীন কয়েকটি অধিকার আলোচনা করা হলো-

১। জীবনধারণের অধিকার : ব্যক্তির জীবনের পূর্ণ বিকাশের জন্য রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত সব সুযোগ-সুবিধাই হলো জীবনধারণের অধিকার।

এই অধিকারবলে ব্যক্তি তার জীবন রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পেয়ে থাকে।

নিজের জীবন রক্ষা করা মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এটি সব অধিকারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

২। শিক্ষা লাভের অধিকার : শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষা ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা জাতি উন্নতি করতে পারে না।

আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় শিক্ষা নাগরিকের একটি অন্যতম সামাজিক অধিকার।

শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে মানুষ সচেতন হয়ে নিজের ও জাতীয় উন্নয়নে কাজ করতে পারে।
অধ্যাপক লাস্কি শিক্ষার অধিকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক অধিকার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার

অধিকার : গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত হচ্ছে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে স্বাধীনভাবে বস্তুনিষ্ঠ খবরাখবর প্রকাশ করার অধিকারকে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বলে।

গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং জনমত গঠনের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা খুবই প্রয়োজন।

বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে সংবাদপত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সমাবেশ ঘটেছে।

এসব গণমাধ্যমের সাহায্যে বিশ্বের রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের অত্যন্ত কাছে অবস্থান করছে।

তাই প্রগতিশীল সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য সংবাদপত্রের পাশাপাশি এসব মাধ্যমের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

এসব মিডিয়ার মধ্যে রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট খুব দ্রুত জনগণের কাছে খবর পৌঁছে দেয়। তাই এসব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অবশ্যই প্রয়োজন ।

৪। চলাফেরার অধিকার:
চলাফেরার অধিকার নাগরিকের অন্যতম সামাজিক অধিকার।

রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন না করে নাগরিকগণের রাষ্ট্রের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চলাফেরা করার অধিকারকে চলাফেরার অধিকার বলে।

৫। মতামত প্রকাশের অধিকার : স্বাধীনভাবে কথাবার্তা বলা ও মতপ্রকাশের সুযোগই হলো মতামত প্রকাশের অধিকার।

ব্যক্তি তার মতামত অবশ্যই প্রকাশ করতে পারে, কিন্তু দেখতে হবে সেটি যেন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে না যায়।

মানুষের স্বাধীন ও গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা সরকারের নজরে আসে এবং এসব সমস্যার সমাধান হয়।

তা ছাড়া জনমতের উপর ভিত্তি করে যুগে যুগে বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশ সাধিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ম্যাকাইভারের মত হলো, “প্রকৃতপক্ষে মতামতের বিরোধিতা শুধু মতামত দ্বারাই সম্ভবপর।”

দার্শনিক মিলের মতে, “মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অস্বীকার করার কৃষ্ণল এই যে, তা মানবগোষ্ঠীকে লুণ্ঠন করে।”

প্রচলিত আইন বা ব্যবস্থা যদি কোনো নাগরিক অকল্যাণকর মনে করে, তবে সে সম্পর্কে স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার সব নাগরিক ভোগ করবে, অন্যথায় গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়বে।

৬। সম্পত্তি ভোগের অধিকার : সম্পত্তি ভোগের অধিকার গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অধিকার।

রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে প্রত্যেক নাগরিক তার নিজস্ব সম্পত্তি ভোগ করবে। কেউ যাতে অন্যের কোনো কিছু জোর করে দখল করতে না পারে রাষ্ট্র সে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতে, “সম্পত্তির অধিকার সমাজ-বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। এর অনুপস্থিতিতে সমাজ শিথিল হয়ে পড়ে এবং ব্যক্তির পূর্ণ বিকাশ সম্ভব হয় না।

তবে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ব্যক্তিগত সম্পত্তি অর্জন ও ভোগের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করা একান্ত প্রয়োজন।”

রাষ্ট্র নিজের প্রয়োজনে ব্যক্তির সম্পত্তি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ সাপেক্ষে অধিগ্রহণ করতে পারে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা নিষেধ- সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর ও

অন্যভাবে বিলি-ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাইবে না।

৭। ধর্মীয় অধিকার : আইন, জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতা সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্ম অবলম্বন, পালন বা প্রচারের অধিকারই ধর্মীয় অধিকার।

প্রত্যেক ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন, রক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার রয়েছে। কেননা, ধর্ম মানুষের অন্তরের স্পর্শকাতর অনুভূতি।

ধর্মীয় অধিকারের বলে সমাজের সব মানুষ তার নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করে।

৮। পরিবার গঠনের অধিকার : রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরিবার গঠনের অধিকার রয়েছে।

প্রাপ্তবয়স্ক নরনারীগণের নিজেদের পছন্দমতো বা পারিবারিক রীতি মেনে বিবাহ করার অধিকার রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত। পরিবার গঠনের অধিকার নাগরিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অধিকার।